
সোহেল খান দূর্জয়, নেত্রকোনা প্রতিনিধি:
নেত্রকোনা সদর উপজেলার চকপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অবকাঠামোগত সংকট, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা, জলাবদ্ধতা ও বিদ্যালয়ের জমি দখলের অভিযোগে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। জরাজীর্ণ ভবন, শ্রেণিকক্ষের স্বল্পতা, সুপেয় পানির সংকট এবং খেলার মাঠ না থাকায় শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
নেত্রকোনা পৌরশহরের চকপাড়ায় অবস্থিত বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে পাঁচটি শ্রেণিতে ১১২ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন পাঁচজন শিক্ষিকা। সরেজমিনে দেখা যায়, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় দুই শিফটে পাঠদান করতে হচ্ছে। বিদ্যালয়ের প্রবেশপথ সংকীর্ণ, আঙিনায় ময়লা-আবর্জনা জমে রয়েছে এবং জলাবদ্ধতার কারণে পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর হয়ে পড়েছে।
বিদ্যালয়টির চার কক্ষবিশিষ্ট পাকা ভবনের বিভিন্ন স্থানে জরাজীর্ণতার চিহ্ন রয়েছে। শ্রেণিকক্ষের ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থাও নেই। বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় স্যানিটেশন সুবিধা না থাকায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পাশের বাড়ির শৌচাগার ব্যবহার করতে হয় বলে জানা গেছে। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে থাকা খাবার পানির ট্যাপটির অবস্থান নিয়েও স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার উদ্বেগ রয়েছে।
এ ছাড়া বিদ্যালয়ের ভবনের বারান্দা ঘেঁষে টয়লেট, রান্নাঘর ও দেয়াল নির্মাণ করে কিছু অংশ দখলে রাখার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, এসব স্থাপনার কারণে দুর্গন্ধ ও রান্নার ধোঁয়া শ্রেণিকক্ষের পরিবেশে প্রভাব ফেলছে। দখলে থাকা জমি উদ্ধারের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা করেও সমাধান পাওয়া যায়নি বলে দাবি কর্তৃপক্ষের।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা পিয়ারা বেগম বলেন, তিনি যোগদানের সময় বিদ্যালয়ে তিন কক্ষবিশিষ্ট একটি টিনশেড ঘর ছিল। পরে ২০১০ সালে পাকা ভবন নির্মাণ করা হয়। তবে জমির স্বল্পতা এবং কিছু অংশ বেদখলে থাকায় সুপেয় পানি ও স্যানিটেশনসহ প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের মোট জমির পরিমাণ সাত শতাংশ, যা একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য পর্যাপ্ত নয়। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে খেলার মাঠ গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিদ্যালয়ে সে সুযোগ নেই। তাঁর অভিযোগ, পাশের কয়েকজন প্রতিবেশী বিদ্যালয়ের জমির কিছু অংশ দখলে রাখার পাশাপাশি বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অনধিকার প্রবেশ করছেন।
বিদ্যালয়ের সভাপতি চঞ্চল খান বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তাঁকে বিদ্যালয়ের জমিদাতা হিসেবে সভাপতি করা হয়। তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের আগে বিদ্যালয়ে প্রবেশের রাস্তাটি দেড় থেকে দুই ফুট প্রশস্ত ছিল। পরে সেটি আট ফুট করা হয়েছে। এ ছাড়া টিনশেডের একটি শৌচাগার ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে শিক্ষার্থী ও শিক্ষিকাদের চাহিদার তুলনায় এসব সুবিধা এখনো অপ্রতুল।
তিনি আরও বলেন, আগের সময়ে বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা তাঁর জানা নেই। বিদ্যালয়ের বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানে আরও উদ্যোগ প্রয়োজন।
এ বিষয়ে নেত্রকোনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহীদুল আজম বলেন, বিদ্যালয়টির অবকাঠামো ও স্যানিটেশনসংক্রান্ত সমস্যাগুলো দীর্ঘদিনের। বিদ্যালয় পরিচালনা ও উন্নয়নের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের উদ্যোগের ঘাটতি এর পেছনে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে।
তিনি জানান, বিদ্যালয়টির সমস্যাগুলো সমাধানের লক্ষ্যে নতুন প্রকল্প ‘পিডিএ-৫’-এর প্রথম পর্যায়ে এটিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও অন্যান্য সংকট নিরসন হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
দীর্ঘদিনের এসব সমস্যার সমাধানে বিদ্যালয়ের জমি নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, শ্রেণিকক্ষ সংস্কার এবং শিক্ষার্থীদের উপযোগী পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।