
তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ )প্রতিনিধি
চলনবিলে বোরো ধান কাটার মহোৎসব শেষ। মাঠের সোনালী ফসল কৃষকের গোলায় তোলার পর এবার মেহনতি শ্রমিকদের ঘরে ফেরার পালা। তীব্র রোদ আর মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অর্জিত ‘খোরাকির ধান’ পারিশ্রমিক হিসেবে পাওয়া ধানের ভাগ নিয়ে এখন নিজ নিজ গন্তব্যে ছুটছেন হাজারো কৃষিশ্রমিক।
শনিবার (১৬ মে) সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার বারুহাস আঞ্চলিক সড়কে চোখে পড়ল এমনই এক উৎসবমুখর ও তৃপ্তিদায়ক দৃশ্য। চলনবিলের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ধান কাটা শেষ করে শত শত শ্রমিক ট্রাকে করে খোরাকির ধান নিয়ে নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। চলন্ত ট্রাকের ওপর ধানের বস্তার ওপর বসে থাকা ক্লান্তিহীন শ্রমিকদের মুখে তখন ফুটে উঠেছে এক টুকরো স্বর্গীয় হাসি ও স্বস্তির ঝিলিক।
চলনবিল অঞ্চলের নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন মাঠে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দিনরাত পরিশ্রম করেছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা এই দলবদ্ধ শ্রমিকেরা। দৈনিক নগদ মজুরির চেয়ে ধান কাটার বিনিময়ে ধানের ভাগ বা ‘খোরাকি’ পাওয়াই তাদের মূল লক্ষ্য।
বারুহাশ আঞ্চলিক সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ধানের বস্তা বোঝাই ট্রাকের শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, চলনবিলে এবার ধানের ফলন ভালো হওয়ায় তারা পারিশ্রমিকও বেশ ভালো পেয়েছেন। একেকজন শ্রমিক ৮ থেকে ১৫ মণ পর্যন্ত ধান পেয়েছেন। বাজারে চালের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে এই ধান তাদের পরিবারের আগামী কয়েক মাসের খাদ্য নিরাপত্তার এক বিরাট নিশ্চয়তা।
ট্রাকের ওপর ধানের বস্তার পাশে বসে থাকা প্রবীণ শ্রমিক রহমত আলী হাসিমুখে বলেন,কয়ডা সপ্তাহ চলনবিলের মাঠে রোদে পুইড়া, পানিতে ভিজা ধান কাটছি। শরীর তো আর চলে না বাবা! কিন্তু এই যে ট্রাকে কইরা নিজের কামাই করা ধানের বস্তা লইয়া বাড়ি ফিরতাছি, এই আনন্দ কই রাখার জায়গা নাই। বাড়িতে বউ-পোলাপান পথ চাইয়া আছে। এই ধান দিয়া সারা বছরের ভাতের চিন্তা দূর হইলো।
বারুহাস সড়কে দেখা যায়, ধানের বস্তায় ঠাসা প্রতিটি ট্রাক যেন এক একটি ভাসমান উৎসবের মঞ্চ। খা খা রোদের মাঝেও ক্লান্তি দূরে ঠেলে শ্রমিকেরা কেউ কেউ গান গাইছেন, কেউবা মেতে উঠেছেন চিরচেনা গ্রামীণ আড্ডায়। তাদের চোখে-মুখে এখন আর ধান কাটার সেই হাড়ভাঙা খাটুনির ছাপ নেই, বরং সেখানে স্থান করে নিয়েছে বিজয়ের আনন্দ। ট্রাকগুলো যখন বারুহাশ বাজার পার হয়ে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন সড়কের দুই পাশের পথচারীরাও শ্রমিকদের এই আনন্দঘন যাত্রা উপভোগ করছিলেন।
স্থানীয় সচেতন মহল ও কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, চলনবিল অঞ্চলের বোরো মৌসুম কেবল স্থানীয় কৃষকদের ভাগ্যবদল করে না, বরং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাজারো ভূমিহীন কৃষিশ্রমিকের সারা বছরের খাদ্যের সংস্থান করে। ট্রাকে করে এই খোরাকির ধান নিয়ে বাড়ি ফেরার দৃশ্যটি আসলে গ্রামীণ বাংলাদেশের স্বনির্ভরতা ও খাদ্য সুরক্ষার এক জীবন্ত প্রতীক।
দিনশেষে তপ্ত বারুহাস সড়ক ধরে ধানের ট্রাকগুলো ধুলো উড়িয়ে এগিয়ে চলে দূর সীমানায়। আর রেখে যায় মেহনতি মানুষের ঘামে ভেজা হাসির এক চিরন্তন ও অনন্য গল্প।