
ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি:
ইউপি চেয়ারম্যান থেকেও যেন নেই। একদিকে নিরুপায় ইউনিয়ন পরিষদের সচিব, অন্যদিকে ইউপি সদস্যদের অনাস্থা। এই জটিলতায় ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার ৬ নম্বর মাইজবাগ ইউনিয়ন পরিষদে গত এক মাস ধরে কার্যত অচলাবস্থা চলছে। এতে জন্মনিবন্ধন, নাগরিক সনদসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা নিতে এসে ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
সেবা নিতে আসা নাগরিকদের অভিযোগ, জন্মসনদ, নাগরিক সনদ, ওয়ারিশান সনদ ও মৃত্যু সনদের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করাতে এসে তাঁদের বারবার ফিরে যেতে হচ্ছে। এ ছাড়া বয়স্ক ভাতার আবেদন, ভিজিডি, ভিজিএফ ও খাদ্যসহায়তা, সালিস এবং বিরোধ নিষ্পত্তিসহ গ্রামীণ জনপদের মানুষের দৈনন্দিন নানা প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন পরিষদ। কিন্তু কার্যক্রমে অচলাবস্থার কারণে প্রতিদিন বিভিন্ন বয়সী মানুষ সেবা না পেয়ে হতাশা নিয়ে বাড়ি ফিরছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের উন্নয়ন সহায়তা তহবিলের প্রায় ৮ লাখ ৯৬ হাজার ৬০০ টাকা সরকারি বিধি অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদের নির্ধারিত হিসাবে জমা না দিয়ে নিজস্ব তহবিলে রাখেন ইউপি চেয়ারম্যান মো. সাইদুল ইসলাম বাবুল। এ ঘটনায় গত ৬ আগস্ট চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে উন্নয়ন সহায়তা তহবিলের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে অনাস্থা প্রস্তাব দেন পরিষদের ১২ জন নির্বাচিত সদস্য। পরে ওই টাকা ভুলবশত নিজের হিসাবে চলে গিয়েছিল দাবি করে পরিষদের তহবিলে ফেরত দেন চেয়ারম্যান। এরপর থেকেই চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত হয়।
চেয়ারম্যানের অভিযোগ, এ ঘটনার জের ধরে গত ১৩ সেপ্টেম্বর তিনি পরিষদে গেলে প্যানেল চেয়ারম্যান নুরুল আমিন, ইউপি সদস্য হাফিজ উদ্দিনসহ কয়েকজন তাঁকে মারধর করেন। তবে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নুরুল আমিন ও হাফিজ উদ্দিন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইউপি চেয়ারম্যান বাবুলকে বাদ দিয়ে প্যানেল চেয়ারম্যান নুরুল আমিনকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিয়ে পরিষদের কার্যক্রম চালাতে চান ইউপি সদস্যরা। এ জন্য তাঁরা রেজুলেশন করে চেয়ারম্যান বাবুলের আইডি বাতিল এবং প্যানেল চেয়ারম্যান নুরুল আমিনের নামে আইডি ও পাসওয়ার্ড দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে আবেদন করেছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, প্যানেল চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়ে বিরোধের কারণে পরিষদের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
সেবা না পেয়ে ১০ দিন ধরে ইউনিয়ন পরিষদে ঘুরছেন একই ইউনিয়নের কুমড়াশাসন গ্রামের মো. রুবেল মিয়া। তিনি বলেন, ‘আমার বাবার ভোটার আইডি কার্ডে নামের ভুল হয়েছে। আইডি কার্ড সংশোধন করতে হলে জন্মনিবন্ধনও সংশোধন করতে হয়। এ জন্য ১০ দিন ধরে পরিষদ থেকে ইউএনওর কার্যালয়ে ঘুরেও কোনো সেবা পাইনি। আমার মতো অনেকেই এভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।’
আরেক সেবাপ্রার্থী হিমেল মিয়াও জন্মনিবন্ধন করাতে আট দিন ধরে ঘুরছেন। কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এভাবে কি একটা ইউনিয়ন পরিষদ চলতে পারে? জনভোগান্তি লাঘবে দ্রুত কার্যকর সমাধান চাই।’
স্থানীয় বাসিন্দা, উপজেলা জামায়াতের শুরা সদস্য ও মাইজবাগ ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি মো. আকরাম হোসেন মনোয়ার (৩৫) বলেন, এক মাসেরও বেশি সময় ধরে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। জন্মসনদ, নাগরিক সনদ, ওয়ারিশান সনদ ও মৃত্যু সনদের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে এসে মানুষ ফিরে যাচ্ছেন।
এ বিষয়ে পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান নুরুল আমিন ও ইউপি সদস্য হাফিজ উদ্দিন বলেন, ‘পরিষদের উন্নয়ন তহবিলের অর্থ আত্মসাতের কারণে আমরা চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অনাস্থা দিয়েছি। আমরা তাঁকে মারধর করিনি। এ অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। চেয়ারম্যানের কাছে অনেক মানুষ টাকা পান। সে কারণে তিনি পরিষদে আসেন না। এতে এক মাস ধরে সাধারণ মানুষ নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।’
নুরুল আমিন আরও বলেন, চেয়ারম্যানের আইডি বাতিল করে প্যানেল চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর নামে আইডি ও পাসওয়ার্ড দেওয়ার জন্য সব ইউপি সদস্য ইউএনওর কাছে আবেদন করেছেন। তাঁর নামে আইডি ও পাসওয়ার্ড দেওয়া হলে জনভোগান্তি দূর হবে বলে তিনি দাবি করেন।
মাইজবাগ ইউনিয়ন পরিষদের সচিব হাসানুজ্জামান বলেন, ‘এক মাস ধরে এই সমস্যা চলছে। তবে গত ১৫ দিন ধরে একেবারেই কার্যক্রম বন্ধ। এতে জনভোগান্তি প্রকট আকার ধারণ করেছে। আমি চাই, উভয় পক্ষের সমঝোতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হোক।’
ইউপি চেয়ারম্যান মো. সাইদুল ইসলাম বাবুল বলেন, ‘ভুলবশত উন্নয়ন তহবিলের টাকা আমার ব্যক্তিগত হিসাবে চলে আসে। পরে আমি সেই টাকা ফেরত দিয়েছি। তবু প্যানেল চেয়ারম্যান নুরুল আমিন ও সদস্য হাফিজ উদ্দিন আমাকে মারধর করেছেন। পরিষদে গেলে প্রাণনাশসহ বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্লক করে রাখা হয়েছে। এ কারণে মানুষ নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ইউএনও মহোদয় চাইলে বিষয়টি সমাধান করতে পারেন।’
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা রহমান বলেন, ‘মাইজবাগ ইউনিয়ন পরিষদের বিষয়টি নিয়ে তদন্তকাজ চলছে। জন্মনিবন্ধনসহ জরুরি সেবা চালু রাখতে ইউনিয়ন পরিষদের সচিবকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’