
দৃশ্যপট ডেস্ক
ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটার আগেই গ্রামের পথ ধরে একে একে মাঠে আসেন কিশোরী ও তরুণীরা। কারও হাতে ফুটবল, কারও কাঁধে ব্যাগ। কিছুক্ষণের মধ্যেই সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার নিমগাছী হাইস্কুল মাঠ মুখর হয়ে ওঠে দৌড়, শরীরচর্চা, পাসিং, ড্রিবলিং ও শটের অনুশীলনে। প্রত্যন্ত গ্রামের এসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মেয়ের চোখে তখন একটাই স্বপ্ন—একদিন জাতীয় দলের লাল-সবুজ জার্সি গায়ে দেশের হয়ে মাঠে নামা।
রায়গঞ্জের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী প্রমিলা ফুটবল একাডেমির খেলোয়াড়দের কাছে ফুটবল শুধু খেলা নয়; এটি আত্মবিশ্বাস অর্জন, সামাজিক বাধা পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া এবং নিজেদের পরিচয় গড়ে তোলার অন্যতম মাধ্যম। পড়াশোনার পাশাপাশি নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেদের দক্ষ করে তুলছেন তারা।
প্রচণ্ড রোদ-বৃষ্টি, পারিবারিক ব্যস্ততা কিংবা আর্থিক সংকট—কোনো কিছুই তাদের স্বপ্নের পথে পুরোপুরি বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। প্রতিদিনের অনুশীলনে ফিটনেস, বল নিয়ন্ত্রণ, পাসিং, ড্রিবলিং, শুটিং ও গোলকিপিংয়ের পাশাপাশি শৃঙ্খলা ও দলগত খেলার কৌশলও শেখানো হয়।
খেলোয়াড় নিবেদিতা রানী মাহাতো ও বর্ষা মাহাতো বলেন, “ফুটবল আমাদের কাছে শুধু খেলা নয়, এটি আমাদের স্বপ্ন। লেখাপড়ার পাশাপাশি নিয়মিত অনুশীলন করছি। ভালো প্রশিক্ষণ ও সুযোগ-সুবিধা পেলে একদিন বড় পর্যায়ে খেলতে চাই। দেশের হয়ে মাঠে নামার স্বপ্ন রয়েছে।”
একাডেমির সাবেক ও বর্তমান খেলোয়াড়দের সাফল্য নতুনদের স্বপ্ন আরও বড় করেছে। প্রশিক্ষণ নিয়ে অয়ন্ত বালা মাহাতো জাতীয় নারী ফুটবল দলে সুযোগ পেয়েছেন। তিথী রানী মাহাতো বয়সভিত্তিক পর্যায়ে খেলার সুযোগ পেয়েছেন এবং অনামিকা উরাও ফুটসাল লিগে খেলছেন। তাঁদের সাফল্য এখন অন্য মেয়েদের কাছেও জাতীয় পর্যায়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা।
খেলোয়াড় প্রিথা মাহাতো ও মোহনা উরাও বলেন, “আমাদের একাডেমি থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে অয়ন্ত বালা মাহাতো জাতীয় পর্যায়ে খেলেছেন। তাঁদের সাফল্য আমাদের আরও অনুপ্রাণিত করে। আমরাও জাতীয় পর্যায়ে খেলতে চাই।”
তবে স্বপ্নের সঙ্গে রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতাও। খেলোয়াড়দের অভিযোগ, পর্যাপ্ত ক্রীড়া সরঞ্জাম, উন্নত প্রশিক্ষণ, পুষ্টিকর খাবার ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ এখনও সীমিত। অনেক পরিবারে খেলাধুলার জন্য আলাদা অর্থ ব্যয়ের সুযোগ না থাকায় প্রতিভাবান অনেক মেয়েকেই নিয়মিত অনুশীলন চালিয়ে যেতে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।
খেলোয়াড় সুষমিতা রানী মাহাতো ও সঞ্চীতা উরাও বলেন, “উন্নতমানের ক্রীড়া সরঞ্জাম, ভালো মাঠ, পুষ্টিকর খাবার ও প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দরকার। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ক্রীড়ানুরাগীরা পাশে দাঁড়ালে আমরা আরও ভালো করতে পারব।”
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী প্রমিলা ফুটবল একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক নিহারঞ্জন সরকার বলেন, ২০১০ সাল থেকে তিনি মেয়েদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছেন। প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত নিমগাছী হাইস্কুল মাঠে বিনা পারিশ্রমিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বর্তমানে একাডেমিতে প্রায় ৬০ জন মেয়ে খেলোয়াড় রয়েছে।
নিহারঞ্জন সরকার বলেন, “এখানে অনেক মেয়েরই ভালো সম্ভাবনা আছে। কিন্তু প্রতিভা থাকলেই হবে না, তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, ক্রীড়া সরঞ্জাম ও প্রতিযোগিতার সুযোগ দিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে প্রত্যন্ত এলাকার এসব মেয়ের মধ্য থেকেই আরও জাতীয় মানের খেলোয়াড় তৈরি করা সম্ভব।”
স্থানীয়দের মতে, মেয়েদের ফুটবলচর্চা রায়গঞ্জের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনও আনছে। একসময় যেসব মেয়ের ভবিষ্যৎ ঘর ও পরিবারের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল, তাঁদের অনেকেই এখন জেলার বাইরে গিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন। কেউ বিকেএসপিতে পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছেন, কেউ বয়সভিত্তিক দলে খেলছেন, আবার কেউ জাতীয় দলের দরজায় পৌঁছে যাচ্ছেন।
রায়গঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ইলিয়াস হোসাইন বলেন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মেয়েদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণ তাদের আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে তারা জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ে আরও ভালো করতে পারবেন। একই সঙ্গে অন্য মেয়েরাও খেলাধুলায় উৎসাহিত হবে।
রায়গঞ্জের প্রত্যন্ত মাঠে প্রতিদিনের এই দৌড় তাই শুধু ফুটবলের অনুশীলন নয়; এটি স্বপ্ন পূরণের প্রস্তুতি। প্রতিটি পাস, প্রতিটি শট আর প্রতিটি গোলের অনুশীলনের মধ্য দিয়ে তারা এগিয়ে চলেছে জাতীয় দলের জার্সির স্বপ্ন নিয়ে। অয়ন্ত বালা মাহাতোর পথ ধরে আরও অনেক মেয়ে জাতীয় ফুটবলে উঠে এলে সেটি হবে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, রায়গঞ্জের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মেয়েদের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, সাহস ও স্বপ্নেরও জয়।
তাই প্রয়োজন শুধু প্রশংসা নয়—প্রয়োজন কার্যকর পৃষ্ঠপোষকতা, উন্নত প্রশিক্ষণ, ক্রীড়া সরঞ্জাম, পুষ্টি, নিরাপদ অনুশীলন পরিবেশ এবং নিয়মিত প্রতিযোগিতার সুযোগ। আজ রায়গঞ্জের প্রত্যন্ত মাঠে যে মেয়েরা ছুটছে, তাদের মধ্য থেকেই হয়তো আগামী দিনে লাল-সবুজের জার্সি গায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন কেউ কেউ।