
রায়গঞ্জ (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার ঘুড়কা নতুনপাড়া গ্রামের ‘কান্দর’ ও ‘গারা ক্ষেত’ এলাকায় দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে চলা জলাবদ্ধতার অবসান ঘটেছে। অবৈধ বাঁধের কারণে পানিবন্দী থাকা প্রায় দুই হাজার বিঘা ফসলি জমি অবশেষে চাষাবাদের উপযোগী হয়ে উঠেছে। এলাকাবাসীর নিজস্ব অর্থায়ন এবং উপজেলা প্রশাসনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে মাটির নিচে ১ হাজার ২০০ ফুট দীর্ঘ ৪০০ এমএম ইউপিভিসি পাইপ স্থাপনের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল খালেক পাটোয়ারী পাইপলাইন স্থাপন কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এর ফলে চলতি মৌসুম থেকেই ওই এলাকার কৃষকরা নতুন করে ফসল আবাদ করতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় তিন দশক আগে কয়েকজন ব্যক্তি কৃষিজমির প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে অবৈধভাবে বাঁধ নির্মাণ করেন। এর ফলে বছরের অধিকাংশ সময় জমিতে পানি জমে থাকত। সামান্য বৃষ্টিতেই বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যেত। এতে আমন, বোরো কিংবা সবজি—কোনো ফসলই নিয়মিত চাষ করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিন জমি অনাবাদি পড়ে থাকায় কৃষকদের মধ্যে চরম হতাশা নেমে আসে।
জলাবদ্ধতার বিরূপ প্রভাব পড়ে এলাকার সামগ্রিক অর্থনীতিতে। অনেক কৃষক ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়েন, কেউ কেউ বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করেন। স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রভাবশালীদের বাধার কারণে তা বাস্তবায়ন হয়নি।
সম্প্রতি বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে উপজেলা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়। এরপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল খালেক পাটোয়ারীর নেতৃত্বে সরেজমিন তদন্ত করা হয় এবং এলাকাবাসীর সঙ্গে একাধিক দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে এলাকাবাসীর সম্মতিতে ও কৃষকদের নিজস্ব অর্থায়নে প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের লক্ষ্যে পাইপলাইন স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিএডিসি রায়গঞ্জ জোনের সহকারী প্রকৌশলী আনন্দ বর্মণ জানান, “৪০০ এমএম ইউপিভিসি পাইপের মাধ্যমে জমে থাকা পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা সম্ভব হবে। এটি একটি কার্যকর ও টেকসই সমাধান। এর সুফল কৃষকরা চলতি মৌসুম থেকেই পাবেন।”
স্থানীয় কৃষক তোমেজ উদ্দিন, শরিফুল ইসলাম খোকন, হানিফ মন্ডল, ছোরহাব, লিটন ও পরেশ তালুকদার বলেন, “প্রায় ৩০ বছর ধরে জলাবদ্ধতার কারণে আমরা সর্বস্ব হারিয়েছি। বৃষ্টি হলেই ধান নষ্ট হয়ে যেত। এখন পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা হওয়ায় আবার চাষাবাদের স্বপ্ন দেখছি।” তারা জানান, এবার আমন মৌসুম থেকেই জমিতে আবাদ শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল খালেক পাটোয়ারী বলেন, “গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমেই বিষয়টি আমাদের নজরে আসে। এলাকাবাসীর অংশগ্রহণে এই দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়েছে, যা সত্যিই প্রশংসনীয়।”
তিনি আরও বলেন, কৃষিজমি রক্ষা ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা টেকসই করতে প্রশাসন প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে। ভবিষ্যতে কেউ অবৈধভাবে বাঁধ নির্মাণ করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, এই উদ্যোগের ফলে শুধু জলাবদ্ধতার সমস্যার অবসানই নয়—দীর্ঘদিনের কৃষি ক্ষতি পুষিয়ে নিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতি আবারও সচল হবে।