
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধিঃ
সিরাজগঞ্জে সার সংকটের বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ ও ডিলাররা অস্বীকার করলেও মাঠে কৃষকের সঙ্গে কথা বলে মিলেছে বিপরীত চিত্র। ৫-৭ দিন ঘুরেও ডিলারদের কাছে সার পাওয়া যাচ্ছে না, এমনটাই দাবি কৃষকদের। আবার পাওয়া গেলেও তা প্রয়োজনের থেকে অনেক কম। এছাড়া খুচরা ডিলারদের বিরুদ্ধে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ কৃষকদের।
তবে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ ও কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) অফিস এবং ডিলাররা বলছে ভিন্ন কথা। তাদের দাবি আগষ্ট মাসের শেষদিন পর্যন্তও গোডাউনে সার মজুদ ছিল। নতুন করে সেপ্টেম্বর মাসের বরাদ্দও পেয়েছেন ডিলাররা।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বহুলী, খোকশাবাড়ী, মেছড়া রায়গঞ্জ উপজেলার নলকা ইউনিয়নের একাধিক কৃষকের সঙ্গে কথা বললে ভিন্ন চিত্র উঠে আসে।
বহুলী ইউনিয়নের বিল গজারিয়া গ্রামের কৃষক মোজাম্মেল ফকির আট বিঘা জমি চাষবাদ করছেন। তিনি ডিলারদের কাছে দশদিন ধরে ঘুরেও সার পাননি বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, ডিলাররা বলে সরকার দেয় না আমরা দেব কোথা থেকে। সার না পেয়ে ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
একই গ্রামের মুকুল ফকির ও লিটনসহ একাধিক কৃষক বলেন, দফায় দফায় ঘুরেও ডিলারদের কাছে সার পাওয়া যায় না। কারও ৫০ কেজি সারের দরকার হলে ১০ কেজি দিয়ে বিদায় করে দেয়। তারা আরও অভিযোগ করেন, প্রতি ১০ কেজি সারে ৩০-৪০ টাকা করে বেশি নিচ্ছে খুচরা ডিলাররা।
ডুমুর গোলামী এলাকার কৃষক আব্দুল মমিন শেখ বলেন, আমার ৫০ কেজির বস্তা লাগবে, আমাকে দিয়েছে ১০ কেজি। তাও আবার ১৫শ টাকা বস্তা হিসেবে দাম নিয়েছে। সাইফুল ইসলাম বলেন, ২০ দিন ধরে ধান রোপন করেছি। ইউরিয়া সার দিতে পারি নাই। শুধু ফসফেট আর পটাশ দিয়েছি।
আব্দুস সামাদ ও রবিউল আলম নামে অপর দুই কৃষক বললেন, আমরা ইউরিয়া সার নেই। জমির ধান নষ্ট হচ্ছে, ডিলারদের কাছে গেলে বলে সার নেই। সারের দামও বেশি নিচ্ছে।
মেছড়া ইউনিয়নের সাতানিয়ার চর এলাকার কৃষক রেজাউল করিম জানান, তিনি এখন পর্যন্ত সার পাননি। সারের কারণে তার জমির ধান নষ্ট হওয়ার উপক্রম।
রায়গঞ্জ উপজেলার নলকা ইউনিয়নের এরান্দহ গ্রামের কৃষক দুলাল হোসেন ৪ বিঘা জমিতে চাষাবাদ করছেন। তিনি বলেন, ডিলারের কাছে সার না পেয়ে এরান্দহ বাজারে ফরহাদের দোকান থেকে প্রতি বস্তায় ৪শ টাকা বেশি দিয়ে কিনেছি।
পাঙ্গাশী ইউনিয়নের কয়াবিল গ্রামের কৃষক ফরিদুল ইসলাম বলেন, যেটুকো সারের প্রয়োজন সেটা পাচ্ছি না। ডিলারদের কাছে গেলে মাত্র ৫-১০ কেজি সার দিচ্ছে। তবে বেশি দাম দিলেই প্রয়োজনীয় সার মিলছে বলে দাবি তার। তিনি জুলফিকার তালুকদারের দোকান থেকে বস্তায় ৫শ টাকা বেশিতে কিনেছেন।
এরান্দহ এলাকার কৃষক রুহুল আমিন, আমজাদ, মালেক ও মোজাম্মেল বলেন, এরান্দহ বাজারে বিসিআইসি খুচরা ডিলার ফরহাদ হোসেন সংকটের কথা বলে বেশি দামে সার বিক্রি করে। ইউরিয়া, টিএসপি ও ডিএপি সার বস্তা প্রতি ৪শ থেকে ৫শ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
তবে কৃষকদের এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন বিসিআইসি ও বিএডিসির ডিলাররা। এরান্দহ বাজারের খুচরা ডিলার ফরহাদ হোসেন বলেন, নির্ধারিত মূল্যেই আমরা সার বিক্রি করছি।
বহুলী ইউনিয়নের ডিলার লুৎফর রহমান বলেন, আমাদের পর্যাপ্ত সার মজুদ আছে। আমরা কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী সার দিচ্ছি।
খোকশাবাড়ী ইউনিয়নের ডিলার ইজাব আলী বলেন, গোডাউনে আগষ্ট মাসের সারই মজুদ রয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে আরও বরাদ্দ পেয়েছি। সারের কোন ঘাটতি নেই। কৃষকদের কাছ থেকে মোবাইল নম্বর নিয়েই সার দেওয়া হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার মেসার্স করিম ট্রেডিংয়ের ডিলার মিজানুর রহমান মেজবা বলেন, আমাদের গোডাউনে পর্যাপ্ত সার রয়েছে। কোন কৃষকই সারের জন্য এসে ফিরে যাচ্ছে না। এক টাকাও বেশি দাম নিচ্ছেন না বলে জানান তিনি।
রায়গঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল খালেক পাটোয়ারী বলেন, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে এক টাকাও বেশি নিলেও ডিলালের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক মোহাম্মদ রেজাউল হক বলেন, আসলে কৃষক সার না পাওয়ার বিষয়ে যেটা শোনা যাচ্ছে সেটা সঠিক নয়। বিভিন্ন নিউজের কারণে কৃষকদের মাঝে আতংক তৈরি হয়েছে। তারা ভাবছে হয়তো রবি মৌসুমে তারা সার পাবে না। আসলে এরকম কোন বিষয় না। এখন ৭৬ হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষ হচ্ছে সেটি আমাদের কাছে মজুদ রয়েছে। গত আগষ্ট মাসে ৪ হাজার ২৯৮ মেট্টিক টন ইউরিয়া, ১ হাজার ২১২ মেট্টিক টন টিএসপি, ১ হাজার ৯০৮ মেট্টিক টন ডিএপি ও ১০৮৩ মেট্টিক টন এমওপি বরাদ্দ ছিল। এছাড়াও সেপ্টেম্বর মাসের বরাদ্দও চলে এসেছে।
জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, আমরা ডিলারদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছি। নির্দেশনা মোতাবেক কৃষককে সার সরবরাহ করতে বলা হয়েছে। উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তাদের ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ডিলার ও কৃষক পর্যায়ে কমনিটরিং করা হচ্ছে। গোয়েন্দা টিম ও আমাদের ভ্রাম্যমান আদালত টিমও কাজ করছে। কোন প্রকার সংকটের সম্ভাবনা নেই।