
রায়গঞ্জ (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধিঃ
বাংলার গ্রামীণ জনপদের বিনোদন ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ ছিল যাত্রাপালা, পালাগান, লোকগান ও নানা লোকজ পরিবেশনা। আধুনিক বিনোদনের নানা মাধ্যমের বিস্তারে সেই ঐতিহ্যের অনেকটাই আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রামীণ লোকসংস্কৃতির সমৃদ্ধ ঐতিহ্য তুলে ধরা এবং হারিয়ে যেতে বসা যাত্রাশিল্পকে টিকিয়ে রাখার প্রত্যয়ে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে আয়োজন করা হয়েছে দুই দিনব্যাপী যাত্রাপালা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নিবন্ধনভুক্ত শতরূপা শিল্পী গোষ্ঠীর ১৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গত ১৩ ও ১৪ আগস্ট উপজেলার শালিয়াগাড়ী বাজার প্রাঙ্গণে এ আয়োজন করা হয়। প্রতিদিন রাত ৯টা থেকে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে যাত্রাপালা, লোকসংগীত ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা উপভোগ করেন বিপুলসংখ্যক স্থানীয় দর্শক।
একসময় শীতের রাত কিংবা বিভিন্ন উৎসব-পার্বণে গ্রামের খোলা মাঠে বসত যাত্রার আসর। গান, অভিনয় ও পালাগানের টানে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসতেন মানুষ। যাত্রাপালা ছিল শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এর মাধ্যমে ইতিহাস, সামাজিক মূল্যবোধ, ন্যায়-অন্যায় ও জীবনঘনিষ্ঠ নানা বার্তাও মানুষের কাছে তুলে ধরা হতো। হারিয়ে যেতে বসা সেই ঐতিহ্যকে নতুন করে মানুষের সামনে ফিরিয়ে আনতেই এ আয়োজন বলে জানান আয়োজকেরা।
দুই দিনের অনুষ্ঠানকে ঘিরে শালিয়াগাড়ী বাজার প্রাঙ্গণে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। সন্ধ্যার পর থেকেই বাড়তে থাকে দর্শনার্থীদের আনাগোনা। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জমে ওঠে যাত্রাপালা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী মানুষ আগ্রহ নিয়ে অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।
আয়োজকেরা বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি ও বিনোদনের নানা মাধ্যমের ভিড়ে গ্রামীণ লোকসংস্কৃতি, যাত্রাপালা ও দেশীয় সাংস্কৃতিক চর্চা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই নিজেদের শেকড়ের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। তাই যাত্রাশিল্প ও লোকসংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে নিয়মিত সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।
শতরূপা শিল্পী গোষ্ঠীর সভাপতি মেহেদী হাসান (বিপ্লব) বলেন, “লোকসংস্কৃতি ও যাত্রাশিল্প আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ আয়োজনের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে।”
শতরূপা শিল্পী গোষ্ঠীর সভাপতি মেহেদী হাসান (বিপ্লবের) সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মো. আব্দুস সাত্তার বাবলু।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সিরাজগঞ্জ-৩ (রায়গঞ্জ, তাড়াশ ও সলঙ্গা) আসনের সংসদ সদস্য ভিপি আইনুল হক। সম্মানিত অতিথি ছিলেন রায়গঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী শেখ আব্দুল রাজ্জাক জুয়েল।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন ধামাইনগর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি মো. রমজান আলী আকন্দ।
এ সময় ধামাইনগর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. নবীর উদ্দিন নবীর, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মো. রিপন হোসেনসহ স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, গণ্যমান্য ব্যক্তি, সাংবাদিক এবং সংস্কৃতিপ্রেমীরা উপস্থিত ছিলেন।
সাংস্কৃতিক কর্মীদের মতে, একটি জাতির পরিচয় তার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার পাশাপাশি নিজেদের লোকজ ঐতিহ্য সংরক্ষণও জরুরি। বিশেষ করে যাত্রাপালা, পালাগান, লোকসংগীত ও গ্রামীণ নাট্যচর্চার মতো ঐতিহ্যবাহী মাধ্যমগুলোকে টিকিয়ে রাখতে নিয়মিত আয়োজন, শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা ও দর্শকদের অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন।
শতরূপা শিল্পী গোষ্ঠীর ১৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এ আয়োজন সেই প্রয়োজনীয়তারই একটি প্রতিফলন বলে মনে করছেন স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমীরা। তাঁদের প্রত্যাশা, এ ধরনের আয়োজনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে একদিকে হারিয়ে যেতে বসা লোকঐতিহ্য সংরক্ষিত হবে, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মও নিজেদের শেকড় ও সংস্কৃতির সঙ্গে আরও গভীরভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে।