
ন্যাশনাল ডেস্ক
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আগামীকাল বুধবার (২৬ আগস্ট) লাখো-কোটি মানুষের নবীপ্রেমের আবেগে মুখর হয়ে উঠবে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। আনজুমানে রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহ্যবাহী ৫৫তম জশনে জুলুস। আয়োজকদের প্রত্যাশা, এবারও জুলুসে ৫০ লাখের বেশি মানুষের সমাগম হতে পারে।
এটি কেবল একটি ধর্মীয় শোভাযাত্রা নয়- পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে চট্টগ্রামের ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে থাকা এক অনন্য ঐতিহ্যের নাম জশনে জুলুস। বাংলাদেশে এই ঐতিহ্যের গোড়াপত্তন হয় ১৯৭৪ সালে (১৩৯৪ হিজরি)। কাদেরিয়া তরিকার মহান সাধক আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ (র.)-এর দিকনির্দেশনায় এবং আঞ্জুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় নগরীর বলুয়ার দিঘির পাড় খানকাহ এ কাদেরিয়া সৈয়দিয়া থেকে প্রথম এ জুলুস বের হয়। সময়ের পরিক্রমায় এটি আজ ৫৫তম বর্ষে পদার্পণ করেছে।
শুরুতে সীমিত পরিসরের ধর্মীয় আয়োজন থাকলেও সময়ের সঙ্গে এটি পরিণত হয়েছে বিশাল জনসমাবেশে। চট্টগ্রামের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে নবীপ্রেমিক মানুষ এতে অংশ নেন। জুলুসের দিন ভোর থেকেই নগরীর ষোলশহর ও আশপাশের এলাকায় মানুষের ঢল নামে। কেউ হেঁটে, কেউ বাস, ট্রাক, পিকআপ কিংবা অন্যান্য যানবাহনে এসে শরিক হন এই শোভাযাত্রায়।
এবারের জুলুসে নেতৃত্ব দেবেন দরবারে সিরিকোটের সাজ্জাদানশীন পীর আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ (ম.জি.আ.)। অতিথি হিসেবে থাকবেন সাহেবজাদা সৈয়্যদ মুহাম্মদ কাসেম শাহ (ম.জি.আ.) ও শাহজাদা সৈয়্যদ মুহাম্মদ আকিব শাহ (ম.জি.আ.)। সকাল ৮টায় ষোলশহরের আলমগীর খানকা-এ-কাদেরিয়া সৈয়্যদিয়া তৈয়্যবিয়া থেকে জুলুস শুরু হয়ে বিবিরহাট, মুরাদপুর, ২ নম্বর গেট, জিইসি, ওয়াসা, দামপাড়া, লালখান বাজার ও টাইগারপাস হয়ে আবার একই পথে জুলুস ময়দানে ফিরে আসবে।
জুলুসকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে উৎসবের সাজে সেজেছে চট্টগ্রাম। সড়কের দুই পাশে পতাকা, ব্যানার-ফেস্টুন, তোরণ ও আলোকসজ্জায় বদলে গেছে নগরীর চেহারা। কাজির দেউড়ি, মুরাদপুর, ষোলশহর, জিইসি মোড়, ২ নম্বর গেটসহ আশপাশের বেশ কয়েক কিলোমিটার পথজুড়ে শোভা পাচ্ছে সুদৃশ্য তোরণ, ব্যানার, ফেস্টুন ও রঙিন পতাকা। রাতে বিভিন্ন ভবনে করা হয়েছে বর্ণিল আলোকসজ্জা। পুরো সড়কপথ ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা হয়েছে, আর রাস্তার দু’পাশে টাঙানো হয়েছে দরুদ ও সালাম সংবলিত ব্যানার। আগের বছরগুলোর মতো এবারও নগরের বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও প্রতিষ্ঠানে মিলাদ, মাহফিল, নাতে রাসুল ও দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে। রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন এলাকা থেকে ভেসে আসছে নাতে রাসুল ও ঈদে মিলাদুন্নবীর গজল।
জুলুসের আরেকটি অনন্য দিক মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সেবামূলক অংশগ্রহণ। নগরের বিভিন্ন মোড়ে প্রতিবছর ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগে বিশুদ্ধ পানি, শরবত, শুকনো খাবার, চকলেট, খেজুর ও জিলাপি বিতরণ করা হয়। কোথাও বসে অস্থায়ী খাবারের দোকান, কোথাও আবার টুপি, আতর, তসবিহ, ইসলামি বই, পতাকা, পাঞ্জাবি ও অন্যান্য সামগ্রীর পসরা। ফলে জুলুসকে ঘিরে ধর্মীয় আবেগের পাশাপাশি তৈরি হয় এক বিশেষ সামাজিক-সাংস্কৃতিক আবহ।
জুলুসের মূল সুর অবশ্যই নবীপ্রেম ও ঈদে মিলাদুন্নবীর তাৎপর্য। অংশগ্রহণকারীদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় তাকবির, দরুদ, জিকির, হামদ ও নাতে রাসুল। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (দ.)-এর জন্ম ও ওফাতের স্মৃতিবাহী ১২ রবিউল আউয়ালকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) পালিত হয়। চট্টগ্রামের জশনে জুলুস সেই উপলক্ষকে সম্মিলিতভাবে স্মরণ ও নবীজির প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের একটি বৃহৎ আয়োজন হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিতি পেয়েছে।
এই ঐতিহ্যকে ঘিরে এবারের প্রস্তুতিও ব্যাপক। আয়োজকদের প্রায় ১০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনায় দায়িত্ব পালন করবেন। একইসঙ্গে নগর পুলিশ নিয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থা। জুলুস চলাকালে লালখান বাজার-মুরাদপুর ফ্লাইওভার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী বলেন, জুলুসের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সার্বিক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। অস্ত্র বহন, মুর্তি বা কুশপুত্তলিকা প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জনশৃঙ্খলা রক্ষা করে শান্তিপূর্ণভাবে জুলুস আয়োজনের জন্য সবাইকে অনুরোধ জানাচ্ছি।
জুলুসে অংশ নিতে চট্টগ্রাম ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলা ও দূর-দূরান্ত থেকে গভীর রাত থেকেই লাখ লাখ আশেকে রাসুল জামেয়া ময়দানে সমবেত হতে থাকেন। সব বয়সের ও পেশার মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মিছিলে শরিক হন। এ পদযাত্রায় ফুটে ওঠে অভাবনীয় এক ভ্রাতৃত্ব ও আতিথেয়তার চিত্র। শোভাযাত্রার পুরো পথজুড়ে স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও নানা সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে অংশগ্রহণকারীদের জন্য উন্মুক্ত খাবার, শরবত, পানি, ফলমূল ও তাবাররুক বিতরণের বুথ বসানো হয়। সাধারণ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত দান ও সেবা প্রদর্শনী যেন রাসুল (দ.)-এর প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
আনজুমান ট্রাস্টের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মনজুর আলম মনজু বলেন, জশনে জুলুসের মূল বার্তা হলো- শান্তি, মানবতা, অহিংসা এবং প্রিয়নবীর (সা.) সুন্নাহ ও আদর্শকে জীবনে ধারণ করা। সংকিল ও অশান্ত বিশ্বে প্রিয়নবীর সুমহান আদর্শ প্রচার এবং মুসলিম মিল্লাতের ঐক্য সুদৃঢ় করাই এই জুলুসের প্রধান লক্ষ্য।
জুলুস মিডিয়া কমিটির সদস্য আবু নাছের মোহাম্মদ তৈয়ব আলী বলেন, বিশাল এই জনসমুদ্রের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি আনজুমান ট্রাস্টের হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবক (সিকিউরিটি স্কোয়াড) দায়িত্ব পালন করছেন। সব প্রস্তুতি ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এখন আগামীকাল আবারও মানুষের ঢল নামার অপেক্ষা।