
সোহেল খান দূর্জয়,নেত্রকোনা প্রতিনিধিঃ
‘ঘরে বসেই সহজে আয়’, ‘প্রতিদিন কয়েকটি ভিডিও দেখলেই মিলবে টাকা’—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন লোভনীয় প্রচারণায় নেত্রকোনায় অনলাইনভিত্তিক ‘স্টারলিংক’ নামের একটি অ্যাপে যুক্ত হয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন শতাধিক তরুণ। ভুক্তভোগীদের দাবি, শুরুতে বিনিয়োগের টাকা ও মুনাফার অংশ উত্তোলনের সুযোগ দিয়ে বিশ্বাস অর্জনের পর একপর্যায়ে টাকা উত্তোলন বন্ধ করে দেওয়া হয়।
নেত্রকোনা সদর উপজেলার রৌহা ইউনিয়নের কুমড়ি ও আশপাশের এলাকায় কয়েক শ তরুণ এই অ্যাপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন বলে স্থানীয়দের দাবি। তাঁদের হিসাবে, শুধু কুমড়ি এলাকাতেই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০ লাখ টাকা। তবে এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে মোট ক্ষতির পরিমাণ যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ও পরিচিতজনদের মাধ্যমে অ্যাপটির প্রচারণা চালানো হতো। এক হাজার, দুই হাজার ও তিন হাজার টাকার বিভিন্ন প্যাকেজে বিনিয়োগ করলে প্রতিদিন নির্দিষ্টসংখ্যক ভিডিও দেখার বিনিময়ে আয় করার কথা বলা হতো। শুরুতে অনেকেই টাকা তুলতে পারায় অ্যাপটির প্রতি তাঁদের আস্থা তৈরি হয়। পরে নিজেরা বেশি অর্থ বিনিয়োগের পাশাপাশি বন্ধু, স্বজন ও পরিচিতদেরও যুক্ত করেন।
কুমড়ির এক ভুক্তভোগী সাদিক (ছদ্মনাম) বলেন, শুরুতে তিনি ৫০০ টাকা পর্যন্ত সহজেই উত্তোলন করতে পেরেছিলেন। এতে বিশ্বাস তৈরি হলে তিনি অন্যদেরও অ্যাপটিতে যুক্ত করেন। পরে টাকা উত্তোলনের আবেদন ‘হোল্ড’ বা ‘রিজেক্ট’ দেখাতে শুরু করে। একপর্যায়ে টাকা তুলতে হলে নির্দিষ্টসংখ্যক নতুন সদস্য যুক্ত করার শর্ত দেওয়া হয়। তাঁর দাবি, সব মিলিয়ে তিনি ও তাঁর পরিচিতজনরা প্রায় এক লাখ টাকা হারিয়েছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নতুন সদস্য যুক্ত করার বিষয়টি অ্যাপটির কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। নতুন কেউ বিনিয়োগ করলে আগের সদস্য কমিশন পাবেন—এমন প্রলোভনে সদস্য সংগ্রহ করা হতো। ফলে দ্রুত বিস্তৃত হয় নেটওয়ার্ক। প্রথম দিকে যুক্ত হওয়া কেউ কেউ বিনিয়োগের টাকা ও মুনাফা তুলতে পারলেও পরবর্তী সময়ে যুক্ত হওয়া অনেকেই আর অর্থ ফেরত পাননি।
অনুসন্ধানে ‘স্টারলিংক’ নাম ব্যবহার করে একাধিক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের সন্ধান পাওয়া যায়। এর একটি গ্রুপে ২৪২ জন সদস্য ছিলেন। গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কয়েকজন দাবি করেন, তাঁরা নিজেরাও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজন ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা হারানোর দাবি করেন।
ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠানোর স্ক্রিনশটও পাওয়া গেছে। ওই নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
আটপাড়া উপজেলার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি কার্যালয়ের সহকারী প্রোগ্রামার মো. আশরাফুল হক বলেন, অনলাইন প্রতারণার চক্রগুলো সাধারণত সহজে আয়ের লোভ দেখিয়ে তরুণদের আকৃষ্ট করে। শুরুতে নানা সুবিধা দিলেও একপর্যায়ে বিনিয়োগকারীদের অর্থ হাতিয়ে নেয়। কেউ প্রতারণার শিকার হলে সংশ্লিষ্ট সাইবার কর্তৃপক্ষের কাছে অনলাইনে অভিযোগ করা উচিত।
নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের প্রতারণার শিকার হলে ভুক্তভোগীদের সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা লিখিত অভিযোগ দিতে হবে। অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।