
ন্যাশনাল ডেস্ক
ঘন বন পেরিয়ে পাহাড়ের ঢালে গড়ে ওঠা ছোট ছোট বসতি বা পুঞ্জি। ভোরের কুয়াশা ভেদ করে কেউ যাচ্ছেন পান বাগানে, কেউ আনারস কিংবা কলার ক্ষেতে। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত পাহাড়ি এলাকাগুলোর মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার চিত্র প্রায় এমনই, যেখানে প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সহাবস্থানেই তাদের জীবন, জীবিকা ও সংস্কৃতির বিকাশ। কিন্তু সেই জীবনযাপন আজ নানামুখী সংকটে জর্জরিত। ভূমি হারানোর আশঙ্কা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য, নারীদের নিরাপত্তাহীনতা, ভাষা ও সংস্কৃতির অস্তিত্ব সংকট, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, হয়রানিমূলক মামলা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত—সব মিলিয়ে বহুমাত্রিক সংকটের আবর্তে দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ।
প্রতি বছর ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালিত হলেও বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের কাছে দিনটি কেবল আনুষ্ঠানিকতার নয়; বরং দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অধিকারহীনতা ও প্রত্যাশার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। বছরের পর বছর একই দাবিগুলো উচ্চারিত হলেও বাস্তবে পরিবর্তনের চিত্র খুব একটা দেখা যায় না। দেশের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপে উঠে এসেছে তাদের জীবনের সাতটি বড় সংকটের কথা।
সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে উঠে এসেছে ভূমির অধিকার। টাঙ্গাইলের মধুপুরের জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ইউজিন নকরেক বলেন, বনাঞ্চলে বহু প্রজন্ম ধরে বসবাস করলেও অধিকাংশ পরিবারের জমির আইনগত স্বীকৃতি নেই। ফলে উচ্ছেদের ভয় তাদের প্রতিদিনের সঙ্গী। জমির কাগজপত্র না থাকায় তারা ব্যাংক ঋণও পান না। এতে কৃষিকাজ, জীবিকা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সাঁওতাল নেতা ড. ফিলিমন বাস্কেও ভূমিকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, ভূমিকে কেন্দ্র করেই সবচেয়ে বেশি সংঘাত, নির্যাতন ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। গাইবান্ধার সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, জমির অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে প্রাণ দিতে হয়েছে মানুষকে, আহত হয়েছেন অনেকে। ভূমি সুরক্ষিত না হলে কোনো উন্নয়নই স্থায়ী হতে পারে না।
এই সংকটকে আরও বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করেন অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা। তিনি বলেন, ভূমি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের কাছে শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; বরং জীবন, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের ভিত্তি। অথচ বছরের পর বছর নানা সরকারি-বেসরকারি প্রকল্প, প্রভাবশালীদের দখল, প্রতারণা এবং আইনি সুরক্ষার অভাবে তারা ভূমি হারিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার হলেও থানায় মামলা নিতে অনীহা, তদন্তে গাফিলতি এবং বিচারহীনতার অভিযোগ রয়েছে। তার মতে, ভূমির অধিকার সুরক্ষায় পৃথক আইন প্রণয়ন এবং অন্যায়ভাবে হারানো জমি ফিরিয়ে দেওয়ার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
শিক্ষা এখনো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। পাহাড়, বনাঞ্চল ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যালয়ের অভাব, মানসম্মত শিক্ষকের সংকট এবং মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার সীমিত বাস্তবায়নের কারণে অনেক শিশু শুরু থেকেই পিছিয়ে পড়ে। আদিবাসী ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার মুরইছড়া পুঞ্জির হেডম্যান ফ্লোরা বাবলী তালাং বলেন, খাসিয়া পুঞ্জিগুলোতে সরকারি বিদ্যালয়ের সুযোগ খুবই সীমিত। কমিউনিটি স্কুল থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা যথেষ্ট নয়। ড. ফিলিমন বাস্কে বলেন, ‘বহু বছর ধরে মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার দাবি জানানো হলেও সাঁওতাল শিশুদের জন্য তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।’
শামসুল হুদা মনে করেন, মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা শুধু নীতিমালায় থাকলেই হবে না, বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট ভাষাভাষী শিক্ষক তৈরি ও প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তরুণদের দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
স্বাস্থ্যসেবা ক্ষেত্রেও বৈষম্য স্পষ্ট। দুর্গম এলাকায় বসবাসের কারণে অনেককে সামান্য চিকিৎসার জন্যও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। ফ্লোরা বাবলী তালাং বলেন, অনেক ক্ষেত্রে সাত থেকে আট কিলোমিটার দূরের উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়। এতে অন্তঃসত্ত্বা নারী, শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন।
নৃগোষ্ঠীর নারীদের নিরাপত্তা নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। ইউজিন নকরেক বলেন, ‘জীবিকার প্রয়োজনে শহরমুখী অনেক তরুণী প্রতারণা, শোষণ ও সহিংসতার শিকার হন। অন্যদিকে ভূমি নিয়ে বিরোধের প্রভাবও নারীদের ওপর বেশি পড়ে। ফ্লোরা বাবলী তালাংয়ের মতে, একটি জনগোষ্ঠীর ভূমির নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সেই জনগোষ্ঠীর নারীদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয় না।’
ভাষা ও সংস্কৃতির সংকোচন আরেকটি বড় বাস্তবতা। ড. ফিলিমন বাস্কের মতে, সাংস্কৃতিক একাডেমি, গবেষণাগার, পাঠাগার ও জাদুঘরের অভাবে নতুন প্রজন্ম নিজেদের ইতিহাস, ভাষা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হারাচ্ছে। ফলে ধীরে ধীরে তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
অর্থনৈতিক বৈষম্যও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলছে। ইউজিন নকরেক বলেন, ‘জমির কাগজপত্র না থাকায় সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া যায় না। উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারজাত করতেও দালাল ও পরিবহননির্ভর সিন্ডিকেটের কারণে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হতে হয়। ফ্লোরা বাবলী তালাং জানান, পানবাগান কেটে দেওয়া, ফসল নষ্ট করা কিংবা চুরির মতো ঘটনাও তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে আরও দুর্বল করে তুলছে।’
সবশেষে রয়েছে হয়রানিমূলক মামলা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। ভূমিবিরোধকে কেন্দ্র করে মিথ্যা মামলার অভিযোগ প্রায় সব প্রতিনিধিই তুলেছেন। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বনজ সম্পদ, কৃষি এবং ঐতিহ্যগত জীবিকাও ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
শামসুল হুদা বলেন, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের সংকটকে কোনো বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীর সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সংবিধান অনুযায়ী সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তিনি বলেন, পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার একটি ক্ষুদ্র অংশ হলেও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে তাদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই তাদের ভূমি, ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনধারা রক্ষা করা শুধু মানবাধিকার নয়, পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়নেরও অপরিহার্য শর্ত।’
প্রতিনিধিদের অভিমত, ভূমির অধিকার নিশ্চিত করা, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, নারীদের নিরাপত্তা জোরদার, ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা এবং হয়রানিমূলক মামলা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে প্রতি বছর আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ফিরে আসবে, কিন্তু সংকটের তালিকা একই থেকে যাবে।
আদিবাসী দিবসের আয়োজন
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আজ সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের উদ্যোগে আলোচনা সভা, র্যালি ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার আয়োজন করা হয়েছে। ‘আদিবাসী জীবন ও ঐতিহ্যগত জ্ঞান সুরক্ষায় এগিয়ে আসুন’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা)। অনুষ্ঠানে সংহতি বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষক, গবেষক, মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের।
তাদের মধ্যে রয়েছেন সংসদ সদস্য আয়েশা সিদ্দিকা, সাবেক সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির উপদেষ্টা উষাতন তালুকদার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, লেখক ও সাংবাদিক মহিউদ্দিন আহমদ, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, সিপিবির সভাপতি শাহ আলম, বাসদের আহ্বায়ক বজলুর রশীদ ফিরোজ, বাসদের সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ, মানবাধিকারকর্মী ও লেখক খুশী কবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. জাকির হোসেন, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক লায়েকুজ্জামান এবং কবি সিপার আহমেদ। আলোচনা শেষে বর্ণাঢ্য র্যালি ও বিভিন্ন জাতিসত্তার শিল্পীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হবে।
সূত্রঃ দৈনিক কালবেলা।