
বিনোদন ডেস্ক
গিটারের চেনা ঝংকার, কণ্ঠের দারুণ আবেদন আর সুরের মহিমায় ফ্রান্সের প্রবাসীদের অন্য এক অনির্বচনীয় সন্ধ্যায় ভাসিয়ে দিলেন দেশীয় ব্যান্ড সংগীতের কিংবদন্তি নগরবাউল জেমস। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তিনি যখন মঞ্চে উঠলেন, তখন পুরো প্রাঙ্গণজুড়ে উল্লাসের ঢেউ; চারপাশে কেবলই ‘লাভ ইউ গুরু’ ধ্বনি। সুরের জাদুতে প্রবাসীদের হৃদয় জয় করার পাশাপাশি দর্শকদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে সবার প্রতি শুভকামনা প্রকাশ করেন এবং সকলের দোয়া চান এই রকস্টার।
শাহ গ্রুপ ও অফিওরার যৌথ উদ্যোগে ইউরোপের স্মরণকালের সেরা এই মেগা আয়োজনে অংশ নেন হাজারো প্রবাসী বাংলাদেশি। ‘ফ্রাঙ্কো বাংলা সামার ফেস্ট ২০২৬’ শীর্ষক এ জমকালো উৎসবের প্রাঙ্গণ ছিল প্যারিসের উপকণ্ঠ সার্সেলের মাঠ। দিনব্যাপী এই মেগা উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় দুপুর ১২টায়। তবে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৯টায় মাথায় ঐতিহ্যবাহী লাল
গামছা, পরনে খয়েরি টি–শার্ট আর কালো জিন্সে যখন মঞ্চে আবির্ভূত হন জেমস, তখন উপস্থিত হাজার হাজার দর্শকের মাতম ও উচ্ছ্বাস ছুঁয়ে যায় গগন। ‘কবিতা, তুমি স্বপ্নচারিণী হয়ে খবর নিও না’ গান দিয়ে জেমস তাঁর জাদুঘর উন্মোচন করেন। এরপর একে একে পরিবেশন করেন ‘ও বিজলি চলে যেও না’, ‘সুলতানা বিবিয়ানা’, ‘গুরু ঘর বানাইলা কী দিয়া’, ‘মা’, ‘বাবা’, ‘দুষ্টু ছেলের দল’, ‘দিওয়ানা মাস্তানা’, ‘আসবার কালে আসলাম একা’, ‘পাগলা হাওয়া’ এবং ‘ভিগি ভিগি’র মতো চিরসবুজ সব হিট গান। রাত প্রায় ১১টা পর্যন্ত প্রিয় শিল্পীর সুরের মূর্ছনায় নেচে-গেয়ে পুরো পরিবেশকে মাতিয়ে রাখেন ভক্তরা। গান পরিবেশন শেষে জেমস উপস্থিত প্রবাসী ভক্তদের প্রতি ভালোবাসা জ্ঞাপন করেন এবং সবার কাছে দোয়া চান।
ইউরোপের বুকে স্মরণকালের সেরা এই মেগা উৎসবকে কেন্দ্র করে শুধু প্যারিস নয়, ফ্রান্সের বিভিন্ন দূরদূরান্তের শহর ও ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকেও হাজার হাজার জেমস-ভক্তদের ঢল নামে। লিওন শহর থেকে আসা দর্শক আবির বলেন, ‘ফ্রান্সে এত বড় আয়োজন সচরাচর দেখা যায় না। আর জেমস ভাই মানেই বাড়তি উন্মাদনা, তাই এত দূর থেকে ছুটে আসা।’
বেলজিয়াম থেকে আসা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজক চয়ন রায় বলেন, ‘জেমস মানেই মঞ্চ কাঁপানো পারফরম্যান্স। প্রবাসে দেশের এমন অনুভূতি ভাগ করে নিতেই আসা।’
আয়োজকদের মতে, সন্ধ্যার দিকে মাঠের উপস্থিতি চার হাজার ছাড়িয়ে যায়। দিনব্যাপী এ বিশাল আয়োজনে কেবল সংগীতই ছিল না, ছিল যেন প্রবাসে গড়ে ওঠা এক টুকরো বাংলাদেশ। গ্রীষ্মের তীব্র রোদ উপেক্ষা করে বাবার হাত ধরে আসা ছোট্ট শিশু, চিরচেনা শাড়িতে পরবাসী নারী কিংবা দল বেঁধে আসা তরুণদের পদচারণায় মুখরিত ছিল মেলাপ্রাঙ্গণ। ছিল শিঙাড়া, সমুচা, ফুচকা, বিরিয়ানি, ঝালমুড়ি, পিঠাপুলি, ডাবের পানি আর চায়ের জমজমাট আড্ডা। প্রবাসের ব্যস্ততায় দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকা বন্ধু, স্বজন ও সহকর্মীদের মহামিলনমেলায় রূপ নেয় সার্সেল মাঠ। উৎসবের অংশ হিসেবে নারী ও শিশুদের জন্য ছিল বিনোদনমূলক প্রতিযোগিতা এবং আকর্ষণীয় র্যাফেল ড্র, যেখানে প্রথম পুরস্কার হিসেবে একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি জিতে নেন রেজওয়ানা চৌধুরী মিম।
সংগীতশিল্পী রাহুল আনন্দ
সংগীতসন্ধ্যায় জেমস ছাড়াও অসাধারণ পারফর্ম করেন জনপ্রিয় লোকজ ফিউশন ব্যান্ড ‘জলের গান’-এর ভোকালিস্ট রাহুল আনন্দ, নেদারল্যান্ডস থেকে আসা শিল্পী বিন্তি এবং স্থানীয় শিল্পী ইমতিয়াজ রনিসহ অন্যান্যরা। অফিওরার পরিচালক কৌশিক রাব্বানীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন শাহ গ্রুপের স্বত্বাধিকারী সাত্তার আলী সুমন, এবং শাহ গ্রুপের সিইও ও আমাদের কথা পত্রিকার প্রকাশক ফাতেমা খাতুন। স্থানীয় ফরাসি সংসদ সদস্য কার্লোস মার্টেন্স বিলোঙ্গো ও সার্সেলের ডেপুটি মেয়র নাবিল চাবানে।
আয়োজন প্রসঙ্গে শাহ গ্রুপের চেয়ারম্যান সাত্তার আলী সুমন (শাহ আলম) এবং অফিওরার ব্যবস্থাপনা পরিচালক কৌশিক রাব্বানী খান বলেন, ‘ইউরোপে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি ও নতুন প্রজন্মের মাঝে দেশীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ সুদৃঢ় করতেই আমাদের এই প্রবাস মেলবন্ধন।’
প্যারিসপ্রবাসী কলামিস্ট ও গবেষক আহমেদ সোহেল ইউরোপের স্মরণকালের সেরা এই মেগা আয়োজন নিয়ে অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, ‘বর্তমান সময়ে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের কাছে এই অনুষ্ঠান প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির খরায় এক পশলা বৃষ্টির মতো প্রশান্তি এনে দিয়েছে।’ এমন সফল এবং বর্ণাঢ্য আয়োজনের জন্য তিনি আয়োজকদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান।
সূত্রঃ দৈনিক কালবেলা।