
ন্যাশনাল ডেস্ক
আগামী শিক্ষাবর্ষের ষষ্ঠ, অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণির তিন লটে ৮ লাখ ৮৭ হাজার ৬১৮ কপি বই ছাপার কাজ পেয়েছে অ্যারিস্টোক্র্যাটস সিকিউরিটি প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেড। অথচ এখন পর্যন্ত একটি বইও দিয়ে প্রাক্-সরবরাহ পরিদর্শন (পিডিআই) শেষে সরবরাহ করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। ছাপা শেষে তাদের বই বাঁধাই হয়েছে মাত্র ১৪.৫২ শতাংশ। একই অবস্থা বলাকা প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্সের। অষ্টম শ্রেণির চার লটে ২১ লাখ ১৮ হাজার ৮৯৩ কপি বই ছাপার কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠানটি ৩৩ দিনে সরবরাহ করেছে মাত্র ১৩.০১ শতাংশ বই। শুধু এই দুটি নয়; অধিকাংশ মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানেই বিনামূল্যের পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে ঢিমেতালে।
এবার মোট ১১৩টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪০টিই এক-তৃতীয়াংশও বই এখনো সরবরাহ করতে পারেনি। ২৩টি প্রেস থেকে এখনো একটি বইও মাঠপর্যায়ে যায়নি। অন্যদিকে, অর্ধেকের বেশি কাজ শেষ করতে পেরেছে ৫১টি প্রেস। শতভাগ কাজ শেষ হয়েছে মাত্র চারটির। এই পরিস্থিতিতে নির্ধারিত সময়ে শিক্ষার্থীদের হাতে সব বই তুলে দিতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে পিছিয়ে থাকা প্রেসগুলো। তবে এই ধীরগতির পেছনে কিছু অসাধু প্রেসমালিকের কৌশল রয়েছে বলেও জানিয়েছেন অনেকে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, শেষ মুহূর্তে বই সরবরাহের চাপ বাড়লে কাগজের মান যাচাই ও ছাপার গুণগত মান নিশ্চিত করার সুযোগ কম হয়। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিম্নমানের কাগজে ছাপানো বই গছিয়ে দেয় এসব অনেক প্রতিষ্ঠান।
এনসিটিবি সূত্র জানায়, আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য ৬২৩টি লটে ২৮ কোটি ১১ লাখ ৪০ হাজার ৭৪৫ কপি বই ছাপানো হচ্ছে। এসব বই ছাপার কাজ করছে ১১৩টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান। গত ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত গড় ছাপার কাজ শেষে পিডিআই সম্পন্ন হয়েছে ৫২.৪৮ শতাংশ। তবে ৬২.৩৫ শতাংশ ছাপা এবং ৬৪.৪৮ শতাংশ বাঁধাই হয়েছে। আগামী ৩ ডিসেম্বরের মধ্যে সব বই সরবরাহের কথা প্রতিষ্ঠানগুলোর।
সূত্র আরও বলছে, বই ছাপা শেষে এনসিটিবি তৃতীয় পক্ষকে দিয়ে প্রাক্-সরবরাহ পরিদর্শন (পিডিআই) করে। এই পরিদর্শনে ছাড়পত্র পেলেই মূলত বইগুলো মাঠপর্যায়ে পাঠানোর অনুমতি পায়। তবে যে বই পিডিআই করা হয়েছে বলা হচ্ছে বাস্তবে তত বই পিডিআই হয়নি। মূলত তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রেস মালিকদের সঙ্গে আঁতাত করে বেশি বই পিডিআই দেখাচ্ছে। এনসিটিবির কর্মকর্তারাও মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শনে গিয়ে পাচ্ছেন এমন চিত্র।
২৩টি প্রেসের কোনো বই মাঠে যায়নি
এনসিটিবির সঙ্গে বই ছাপার চুক্তির এক মাসের থেকে বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ২৩টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান এখনো এক কপি বই সরবরাহ করতে পারেনি। এই প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- আল মিশর আর্ট প্রেস, অ্যারিস্টোক্র্যাটস সিকিউরিটি প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেড, ব্লক টেকনোলজি প্রেস, বরাক প্রিন্টার্স, দোহার প্রিন্টিং প্রেস, ফাহাদ প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন, ফেরদৌস প্রিন্টিং অ্যান্ড প্রেস, হুমায়রা প্রিন্টার্স, ইসলামিয়া অফসেট প্রিন্টিং পাবলিকেশন্স, জিতু অফসেট প্রিন্টিং প্রেস, জনপ্রিয় কালার প্রিন্টার্স, জয় প্রিন্টিং প্রেস, কাগজী মুদ্রায়ণ, লিপি প্রিন্টিং প্রেস, এম আর প্রিন্টিং প্রেস, মেসার্স জননী প্রিন্টার্স, অক্সফোর্ড প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স, পলাশ প্রিন্টিং, পিবিএস প্রিন্টার্স, শামীম প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন্স, সোহাগী প্রিন্টার্স, সোনাবরু প্রিন্টিং প্রেস ও সুবর্ণা প্রিন্টার্স। তবে এসব প্রেসের অনেক বই ছাপা ও বাঁধাই হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বই ছাপার অগ্রগতি ৩৩ শতাংশের কম ১৭ প্রেসের
বই ছাপার কাজে ধীরগতি রয়েছে আরও অনেক প্রতিষ্ঠানেই। এর মধ্যে ১৭টি ছাপাখানা আছে, যারা এখনো ৩৩ শতাংশ বই সরবরাহ করতে পারেনি। এর মধ্যে অনেক ছাপাখানার আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে শতভাগ বই সরবরাহের কথা। এক-তৃতীয়াংশের কম বই সরবরাহ করেছে এমন তালিকায় থাকা ছাপাখানার মধ্যে রয়েছে আনন্দ প্রিন্টিং লিমিটেড ২৭.৮৯ শতাংশ, অনিন্দ্য প্রিন্টিং প্রেস ২৬.৬৭ শতাংশ, বলাকা প্রেস ১৩.০১ শতাংশ, দশদিশা প্রিন্টার্স ২৪.১৫ শতাংশ, ইস্টার্ন প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং ২০.৮২ শতাংশ, ফরাজি প্রেস ২৪.৭২ শতাংশ, কর্ণফুলী আর্ট প্রেস ৩৩.৯ শতাংশ, লেটার এন কালার ২৯.৪৮ শতাংশ, মেসার্স মারেজ প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স ২১.৯৪ শতাংশ, পলি প্রিন্টিং প্রেস ৩৩.৬০ শতাংশ, প্রাইম প্রিন্টার্স ৩.০৩ শতাংশ, এস আর প্রিন্টিং লিমিটেড ২৪.৭৮ শতাংশ, সাগরিকা প্রিন্টার্স ১৭.৫১ শতাংশ, সরকার প্রেস ৩৩ শতাংশ, শৈলী প্রিন্টার্স ৩১.৮১ শতাংশ, সীমান্ত প্রিন্টার্স ২৮.২৯ শতাংশ, সোহাগ প্রিন্টার্স ২১.২৪ শতাংশ।
৫০ শতাংশের কম আরও ১৮ প্রেসের
মোট কাজের ৫০ শতাংশের কম শেষ হয়েছে এমন প্রেসগুলোর মধ্যে আলিফ প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিং ৩৪.৬৪ শতাংশ, আমিন আর্ট প্রেস ৪৪.৮১, অনন্যা প্রিন্টিং ৪১.৭২, এপ্রেক্স প্রিন্টিং ৪৯.২৫, বাংলাদেশ ডিজিটাল প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং ৪৮.৫৯, বর্ণমালা প্রেস ৩৫.৫৫, বর্ণালী অফসেট প্রিন্টার্স ৪৩.২৩, ব্রাইট প্রিন্টিংয়ের ৪৬.১৭, ফ্যামস প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজেস ৩৫.৮৭, গ্লোবাল প্রিন্টিং ৪৮.৫১, দিগন্ত অফসেট ৩৪.১৭, মিলন প্রিন্টিং প্রেস ৩৫.৩৯, মেসার্স মুত্তাহিদা প্রিন্টার্স ৩৫.৩৮, মানামা প্রিন্টার্স ৩৯.১৭, প্রিয়াঙ্কা প্রিন্টিং ৪৮.৬২, সরকার প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিং ৩৮.৪৮, সমতা প্রেস ৪৯.৪৪ এবং দ্য মক্কা আল-মুকাররমাহ প্রিন্টার্স ৪৩.২৯ শতাংশ বই সরবরাহ করেছে।
৫০ শতাংশের বেশি শেষ হয়েছে ৫১টি প্রেসে: এখন পর্যন্ত ৫০ শতাংশের বেশি বই মাঠপর্যায়ে পাঠিয়েছে এমন তালিকায় রয়েছে ৫১টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেসের ৬৮.৫৬ শতাংশ, আনমন নিউ অফসেট প্রেসের ৬৭.৪৯, আনোয়ার প্রিন্টিংয়ের ৬৪.৫৫, অনুপম প্রিন্টার্সের ৫৩.১৪, অরোরা প্রিন্টার্স ৫৮.৫৮, অটো প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ের ৬১.৭৪, বাকো অফসেটের ৬২.৮১, বর্ণশিখা অফসেটের ৫৮.৯২, বারোতোপা প্রিন্টার্সের ৮৪.১৩, ভাই ভাই প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনের ৬৭.৫৪, বর্ণশোভা মুদ্রণের ৬৮.২৯, বৃষ্টি প্রিন্টিং প্রেসের ৫২.৪৭, দোয়েল প্রিন্টার্সের ৬৬.৮৩, ফাহিম প্রিন্টিং ৮৬.৬৩, ফাইজা প্রিন্টিং ৫৫.৩১, হাওলাদার অফসেট প্রেস ৬৯.১৭, ইন্টারনেট ওয়েভ প্রিন্টার্স ৫১.৭৩, জনতা প্রেসের ৭৫.০৬, কাশেম অ্যান্ড রহমান প্রিন্টিংয়ের ৬০.৮৪, লিখন আর্ট প্রেসের ৭৬.৮২, মেসার্স ঢাকা প্রিন্টার্সের ৫৩.০২, মেসার্স করতোয়া প্রিন্টার্স অ্যান্ড পাবলিকেশন্সের ৫৯.৭০, ন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেসের ৫৩.৬৩, মেসার্স রেজা প্রিন্টার্সের ৫৫.৬৯, মেসার্স আলিফ প্রিন্টিং প্রেসের ৫৩.১৬, মহানগর অফসেট প্রেস ৬০.৩৫, মাস্টার সিমেক্স পেপার ৮০.৮৯, মেঘদূত প্রিন্টিং প্রেসের ৬৬.০৩, মোল্লা প্রিন্টিং প্রেসের ৬৬.৩৫, মৌসুমী অফসেট প্রেসের ৬৩.৩৪, ন্যাশনাল প্রিন্টার্সের ৬১.৯০, নয়ন মনি প্রিন্টার্সের ৭১.২৭, নিউ সুজন আর্ট প্রেসের ৮৬.৯৯, নুরুল ইসলাম প্রিন্টিং প্রেসের ৫৩.৬৭, প্রিন্ট মাস্টার প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেডের ৭৬.০১, প্রমা প্রেসের ৫০.০১, রেদওয়ানিয়া প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্সের ৬৫.৮৬, রিফাত প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনের ৫৪.৮৯, এসটিএন প্রিন্টার্সের ৯৭.১৯, এসএস প্রিন্টার্সের ৬৯.৯৫, সরকার অফসেট প্রেসের ৬০.০৭, সাফিন প্রেসের ৮১.২৭, শাপলা প্রিন্টার্সের ৫১.০১, শিশির প্রিন্টিংয়ের ৬৮.৯২, সোমা প্রিন্টিং প্রেসের ৭০.৯৭, সোনালী ওয়েভ প্রিন্টার্স ৮৫.২৪, সৃষ্টি প্রিন্টার্স ৭২.৯২, টাঙ্গাইল অফসেট প্রেস ৫৭.৯৯, টাইমস মিডিয়া ৬৩.০৩, ভয়েজার পাবলিকেশন্সের ৫৭.৫৭ এবং কচুয়া প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্সের ৫৬.৪৮ শতাংশ বই মাঠ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
শতভাগ কাজ শেষ করেছে মাত্র ৪ প্রেস: নির্দিষ্ট সময়ের আগে শতভাগ কাজ শেষ করে মাঠপর্যায়ে বই পাঠিয়েছে মাত্র ৪টি প্রতিষ্ঠান। এইগুলো হলো—ফাতিন প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং, ফাইভ স্টার প্রিন্টিং প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স, হাসান প্রিন্টিং অ্যান্ড প্রেস, রাব্বিল প্রিন্টিং প্রেস।
নবম ও দশম শ্রেণির অনেক বই ছাপার কাজই শুরু হয়নি: আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য জন্য নবম ও দশম শ্রেণির বই ছাপায় সবচেয়ে ধীরগতি রয়েছে। এর মধ্যে অনেক প্রেসই এখনো এই দুই শ্রেণির বই ছাপার কাজ শুরুই করেনি। আবার কোনো কোনো প্রেস অষ্টম শ্রেণির অনেক বই ছাপার কাজ শুরু করেনি। এর মধ্যে অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস। তারা অষ্টম শ্রেণির ৩৯ লাখ ৫২ হাজার ৫২৩ কপি এবং ৯ম ও দশম শ্রেণির ৯ লাখ ৫ হাজার ৪০৬ কপি বই ছাপার কাজ পেয়েছে। কাজ পাওয়ার ৩৩ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো এই বইগুলোর এক কপিও ছাপার কাজ শেষ হয়নি। একই অবস্থা আমিন আর্ট প্রেস নবম ও দশম শ্রেণির ৬ লটে ১৫ লাখ ৬৮ হাজার ৭০৮ কপি বই ছাপার কাজ পেয়েছে। চুক্তির ৩৪ দিন পেরিয়ে গেলেও বই ছাপিয়েছে মাত্র ৪.৫৩ শতাংশ।
সার্বিক বিষয়ে মুদ্রণ শিল্প সমিতির উপদেষ্টা তোফায়েল খান বলেন, ‘বই ছাপার অগ্রগতি নিয়ে যে তথ্য দেওয়া হচ্ছে, তার সত্যতা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অনেক উপজেলায় সরবরাহের যে পরিমাণ দেখানো হচ্ছে, বাস্তবে সেই পরিমাণ বই পাওয়া যাচ্ছে না। বই প্রস্তুত না থাকলেও অগ্রগতি প্রতিবেদনে বেশি ডেলিভারি দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। এনসিটিবি যথাযথ উদ্যোগ নিলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কিছু প্রতিষ্ঠান ইচ্ছাকৃতভাবে কাজ শেষ করতে দেরি করছে বলে আশঙ্কা রয়েছে। শেষ মুহূর্তে বই সরবরাহ করা হলে বইয়ের মান ও কাগজ যথাযথভাবে পরিদর্শনের সুযোগ কমে যায়। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এ চর্চা বন্ধ করা জরুরি।’
তবে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু বলছেন, ‘বই ছাপার অগ্রগতি এখনো সন্তোষজন। যারা পিছিয়ে আছে তাদের দ্রুত কাজ শেষ করার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। ৩০ নভেম্বর ৯৫ শতাংশ বই মাঠ পর্যায়ে চলে যাবে বলে আমরা আশাবাদী।’
সূত্রঃ দৈনিক কালবেলা।