
ন্যাশনাল ডেস্ক
বিদ্যালয়ের প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকলেই চোখ আটকে যাবে। মনে হবে, ছোট্ট একটি রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি ট্রেনের বগি। শ্রেণিকক্ষের দরজা-জানালা, বগির গায়ে রেলওয়ের নকশা, নিচে আঁকা চাকা ও রেললাইন। সব মিলিয়ে প্রথম দেখায় যে কারও মনে হতে পারে, ট্রেন বুঝি যাত্রী নিয়ে ছুটে যাওয়ার অপেক্ষায়। তবে একটু কাছে গেলেই বোঝা যাবে, এটি কোনো ট্রেন নয়, একটি বিদ্যালয়।
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী পৌর শহরের উপজেলা পরিষদ পরিচালিত ফুলকুঁড়ি বিদ্যা নিকেতন এখন এমনই ব্যতিক্রমী সাজে শিশুদের আকৃষ্ট করছে। বিদ্যালয়ের একের পর এক শ্রেণিকক্ষ বাংলাদেশ রেলওয়ের যাত্রীবাহী ট্রেনের বগির আদলে রঙ করা হয়েছে। শুধু শ্রেণিকক্ষই নয়, অভিভাবকদের বসার কক্ষটিও সাজানো হয়েছে ট্রেনের ইঞ্জিনের আদলে। ফলে পুরো বিদ্যালয়জুড়ে তৈরি হয়েছে রেলভ্রমণের এক অভিনব আবহ।
শ্রেণিকক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের দেখলেও মনে হবে, তারা যেন ট্রেনে ওঠার অপেক্ষায় থাকা যাত্রী। নীল-ধূসর পোশাকে সারিবদ্ধ শিশুরা আর পেছনে রঙিন ট্রেনের বগির আদলে সাজানো শ্রেণিকক্ষের দৃশ্য যে কারও নজর কাড়বে। বিদ্যালয়ে প্রবেশ করলেই শিশুদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে কৌতূহল, আনন্দ ও নতুন কিছু জানার আগ্রহ।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই পরিবেশ তাদের কাছে একেবারেই অন্যরকম। অনেকেই এখনো বাস্তবে ট্রেনে ওঠেনি। তবে প্রতিদিন ট্রেনের মতো দেখতে শ্রেণিকক্ষে বসেই তারা পড়াশোনা করছে।
শিক্ষার্থী অংকন তাপস্যী, আতিক হাসান ও আদিবা বলে, ‘এই স্কুলে পড়তে আমাদের খুব ভালো লাগে। ক্লাসরুমে বসলে মনে হয়, আমরা যেন ট্রেনে চেপে কোথাও বেড়াতে যাচ্ছি। জানালার পাশে বসে পড়ছি আর বাইরে তাকিয়ে দৃশ্য দেখছি। এমন অনুভূতি আমাদের খুব ভালো লাগে।’
বিদ্যালয়ের বিভিন্ন দেয়ালে আঁকা ট্রেনের ছবি শিশুদের কল্পনাকেও আরও রঙিন করে তুলেছে। ট্রেনের ছুটে চলা, রেলগাড়ির শব্দ আর জানালার পাশ দিয়ে দ্রুত পালিয়ে যাওয়া দৃশ্য নিয়ে শিশুদের কৌতূহলের যেন শেষ নেই। কেউ কেউ কবি শামসুর রাহমানের ‘ট্রেন’ কবিতার ছন্দও আওড়ায়। ফলে বইয়ের পাঠের সঙ্গে বাস্তবের কল্পনাকে মিলিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে তারা।
বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মো. সোহরাব হাসান বলেন, উপজেলা পরিষদ পরিচালিত ফুলকুঁড়ি বিদ্যা নিকেতনের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৮ সালে। শিশুদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে এবং শিক্ষার পরিবেশকে আনন্দময় করতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে সৃজনশীল উদ্যোগ নিয়েছে। ট্রেনের বগির আদলে শ্রেণিকক্ষ রঙ করা সেই উদ্যোগেরই একটি অংশ।
তিনি বলেন, শুধু শ্রেণিকক্ষ নয়, অভিভাবকদের বসার ঘরটিও ট্রেনের ইঞ্জিনের আদলে সাজানো হয়েছে। এতে বিদ্যালয়ের পরিবেশে ভিন্নমাত্রা যোগ হয়েছে। শিশুরা আনন্দ নিয়ে বিদ্যালয়ে আসছে এবং পড়াশোনার প্রতিও তাদের আগ্রহ বাড়ছে।
একজন অভিভাবক বলেন, শিশুদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এভাবে সাজানোর মধ্যে আলাদা ধরনের সৃজনশীলতা রয়েছে। এতে স্কুলে আসার প্রতি শিশুদের আগ্রহ বাড়ে। পাশাপাশি তারা ট্রেন, রেলওয়ে ও যাত্রীবাহী বগি সম্পর্কেও ধারণা পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
বিদ্যালয়ের সভাপতি ও ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ হাছানের উদ্যোগে এই ব্যতিক্রমী ভাবনার বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। তবে বিদ্যালয়ের সাজসজ্জার কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। কাজ শেষ হওয়ার পর এ উদ্যোগের পেছনের পরিকল্পনা ও নিজের অনুভূতি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
শিক্ষার পরিবেশ যে শুধু চার দেয়াল, বেঞ্চ আর টেবিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, ফুলবাড়ীর ফুলকুঁড়ি বিদ্যা নিকেতন যেন তারই উদাহরণ। এখানে ভবনটি স্থির থাকলেও শিশুদের কল্পনার ট্রেন ছুটছে প্রতিদিন। কখনো সেই ট্রেন যাচ্ছে জ্ঞান অর্জনের পথে, কখনো কল্পনার রাজ্যে, আবার কখনো স্বপ্নের ভবিষ্যতের দিকে।
ফুলকুঁড়ি বিদ্যা নিকেতন তাই এখন শুধু একটি স্কুল নয়, শিশুদের কাছে এটি যেন প্রতিদিনের এক আনন্দভ্রমণের ট্রেন।