সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ১০ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে চিকিৎসা নিতে গিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করানোর পরামর্শ পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। চিকিৎসকের কক্ষে রোগীর সমস্যা শোনার পর কয়েকটি পরীক্ষা লিখে দেওয়া হয়। পরে কক্ষ থেকে বের হওয়ার পর চিকিৎসকের সহকারী হাতে ধরিয়ে দেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভিজিটিং কার্ড।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকা পোস্টের সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি মো. নাজমুল হাসান ডেঙ্গু রোগীর লক্ষণ নিয়ে সাংবাদিক পরিচয় গোপন রেখে সাধারণ রোগীর মতো ১০ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে হাসপাতালের ১০৪ নম্বর কক্ষে চিকিৎসা নিতে যান। সেখানে দায়িত্বে ছিলেন ডা. মো. আব্দুর রাজ্জাক।
কক্ষে যাওয়ার পর চিকিৎসক প্রায় এক মিনিটের মধ্যে রোগীর সমস্যার কথা শুনে সিবিসি, ডেঙ্গু, প্রস্রাব পরীক্ষা ও রক্তের সিআরপি পরীক্ষার পরামর্শ দেন। এরপর চিকিৎসকের কক্ষ থেকে বের হওয়ার পর তার হাতে একটি ভিজিটিং কার্ড ধরিয়ে দেন চিকিৎসকের সহকারী।
এ সময় সহকারী বলেন, ‘এই টেস্টগুলো সরকারি হাসপাতালে করলে বেলা ৩টা বাজবে। আপনি আমাদের এখানে এসে টেস্ট করান, এই ডাক্তারই আপনাকে দেখবে।’
ভিজিটিং কার্ডটিতে সিরাজগঞ্জ জেলা শহরের হাজী আহমেদ আলী রোডের ‘তালুকদার হেলথ কেয়ার অ্যান্ড থেরাপি সেন্টার’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। কার্ডে প্রতিষ্ঠানটিকে ‘চর্ম, যৌন, এলার্জি ও বাতব্যথা চিকিৎসা কেন্দ্র’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
জ্বর, মাথাব্যথা ও ডেঙ্গুর মতো উপসর্গ নিয়ে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ওই প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালেই পরীক্ষা করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্ড দেওয়ার ঘটনায়ও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ঘটনার পর বিষয়টি নিয়ে আরও তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রতিবেদক হাসপাতালের ১০৪ নম্বর কক্ষের বাইরে অবস্থান করেন। একপর্যায়ে কোনোভাবে তার সাংবাদিক পরিচয় জানতে পারেন চিকিৎসকের সহকারীরা। পরে তারা প্রতিবেদককে চিকিৎসকের কক্ষে নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করেন।
এদিকে একই চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নেওয়া মোছা. বিউটি খাতুন নামে এক রোগীও পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়ে অভিযোগ করেছেন। ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, ‘আমি তার কাছে গতকাল গিয়েছিলাম। সে আল্ট্রা দিয়েছিল। জানানো হয় মঙ্গলবার ছাড়া মেয়েদের আল্ট্রা হয় না। পরে বাহিরে থেকে ৮০০ টাকা দিয়ে করিয়েছি।’
এ বিষয়ে ঢাকা পোস্টের সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি মো. নাজমুল হাসান বলেন, ‘সাধারণ রোগীর মতো ১০ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলাম। আমার জ্বর, মাথাব্যথাসহ ডেঙ্গুর মতো কিছু উপসর্গ ছিল। চিকিৎসক খুব অল্প সময়ের মধ্যে কয়েকটি পরীক্ষা লিখে দেন। কক্ষ থেকে বের হওয়ার পর চিকিৎসকের সহকারী যখন সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা করালে দেরি হবে বলে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভিজিটিং কার্ড দিয়ে সেখানে পরীক্ষা করাতে বলেন, তখন বিষয়টি আমার কাছে প্রশ্ন তৈরি করে। একজন সাধারণ রোগী হিসেবে এমন পরামর্শের উদ্দেশ্য কী, সেটি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে।’
তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ডা. মো. আব্দুর রাজ্জাক। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর তিনি বলেন, ‘ওইটা আমার ব্যক্তিগত চেম্বার। আর সেখানে কোনো টেস্টই করানো হয় না। হাসপাতাল থেকে যারা যায়, তার কোনো ভিজিটও নেওয়া হয় না। আপনি যা বলছেন এসব ঠিক নয়।’
বিষয়টি সম্পর্কে সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. এ টি এম নুরুজ্জামানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে তো বক্তব্য দেওয়ার কিছু নেই। বাহিরে আমাদের অভিযোগ বক্স আছে, আপনি সেখানে লিখিত অভিযোগ দিন। আমরা সেটির প্রেক্ষিতে উনার বিরুদ্ধে অভিযোগ নেব।’
এদিকে হাসপাতালের ১০৪ নম্বর কক্ষসহ বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির পানি পড়তেও দেখা গেছে। চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগীদের জন্য এমন পরিবেশ নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে।







