
মো. কাজল ইসলাম, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার বসুনিয়ারহাট আহম্মদিয়া দাখিল মাদ্রাসার গাছ কেটে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির সুপার শাহ মো. নুরে আলম সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, জেলা শিক্ষা অফিস, বন বিভাগসহ ১২টি সরকারি দপ্তরে লিখিত অভিযোগ ও স্মারকলিপি দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ২৫ সেপ্টেম্বর শুক্রবার মাদ্রাসা বন্ধ থাকার দিনে প্রতিষ্ঠানটির মাঠে থাকা একটি বড় আকারের কাঁঠালগাছ কেটে ফেলা হয়। পরে গাছটি স্থানীয় এক কাঠ ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরে স্থানীয়দের বাধার মুখে গাছটি আর বিক্রি করে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। বর্তমানে গাছটি মাদ্রাসার মাঠেই পড়ে রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
বুধবার (৭ অক্টোবর) সরেজমিনে অনুসন্ধান ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের ভাষ্য, মাদ্রাসা বন্ধ থাকার দিনে গাছটি কেটে বিক্রির উদ্দেশ্যে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হলে স্থানীয়রা সেখানে উপস্থিত হয়ে বাধা দেন। এ সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে মাদ্রাসার সুপার ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। পরে কাটা গাছটি মাদ্রাসার মাঠেই পড়ে থাকে।
স্থানীয়দের দাবি, গাছটি বিক্রির জন্য স্থানীয় কাঠ ব্যবসায়ী রিপন মিয়ার সঙ্গে ১৩ হাজার টাকায় কথাবার্তা হয়েছিল।
কাঠ ব্যবসায়ী রিপন মিয়া (৪৫) বলেন, “মাদ্রাসা সুপার আমার কাছে ১৩ হাজার টাকায় কাঁঠালগাছটি বিক্রির বন্দোবস্ত করেছিলেন। গাছটি বিক্রি করে ওই দামে আমার কাছ থেকে ইউক্যালিপটাস কাঠ নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছিল।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাঁঠালগাছটির আগে মাদ্রাসা চত্বরে থাকা আরও চারটি ইউক্যালিপটাসগাছ কেটে বিক্রি করা হয়েছে। তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
স্থানীয় রমজান আলী, নুর ইসলাম, আনিছুর, রাজু আহমেদ, আশরাফুল আলম, রুহুল আমিন, মহুবর রহমান, বাবু বসুনিয়া ও মোখলেছ বসুনিয়াসহ অন্যরা বলেন, মাদ্রাসার গাছ কাটার ঘটনায় তারা স্থানীয়ভাবে বাধা দিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, আগেও চারটি ইউক্যালিপটাসগাছ কেটে বিক্রি করা হয়েছে। বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয়রা প্রায় ৫০ জনের গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে গাছ কাটার অনুমোদন, গাছের মালিকানা ও বিক্রির প্রক্রিয়া এবং এর আগে কাটা গাছগুলোর বিষয়ে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
অভিযোগের বিষয়ে মাদ্রাসার সুপার শাহ মো. নুরে আলম সিদ্দিকীর সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, মাদ্রাসার সভাপতি মাহাবুর রহমানের অনুমতি নিয়েই তিনি গাছটি কেটেছেন। তবে গাছ কাটার বিষয়টি তার ভুল হয়েছে বলেও স্বীকার করেন তিনি।
প্রতিষ্ঠানটির এডহক কমিটির সভাপতি ও বেলগাছা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মাহাবুর রহমান বলেন, মাদ্রাসার ফার্নিচার তৈরির জন্য স্থানীয়দের পরামর্শে গাছটি কাটা হয়েছে। এ ছাড়া মাদ্রাসায় নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। গাছটি ভবন নির্মাণে সমস্যা তৈরি করতে পারে—এ কারণে সেটি কাটার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
কুড়িগ্রাম বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাদিকুর রহমান বলেন, লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর মাদ্রাসার সুপারের কাছে গাছ কাটার বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তার ব্যাখ্যা পাওয়ার পর বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমার কাছে তো সব তথ্য থাকে না। এডিসি (শিক্ষা)-এর সঙ্গে কথা বলেন।”
এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) আসাদুজ্জামানের সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে মাদ্রাসা চত্বরে গাছ কাটার অনুমোদন, বিক্রির প্রক্রিয়া এবং পূর্বে কাটা গাছগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন হবে বলে প্রত্যাশা করছেন স্থানীয়রা।