
ন্যাশনাল ডেস্ক
অর্থসম্পদ বা চাকচিক্য নয়, অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রমই যে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি, তা আবারও প্রমাণ করলেন নেত্রকোনার তরুণ তানভীর রহমান। সদ্য প্রকাশিত ৪৭তম বিসিএসের ফলাফলে পররাষ্ট্র ক্যাডারে দেশসেরা (প্রথম স্থান) হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন তিনি।
তানভীর রহমান নেত্রকোনা সদরের রায়দুম বাগড়া গ্রামের বাসিন্দা আবদুর রহমান ও রিনা পারভীন দম্পতির বড় সন্তান। তার বাবা আবদুর রহমান নেত্রকোনার শামছুদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং মা গৃহিণী। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তানভীর সবার বড়। তার মেজো বোন আফসানা রহমান শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সাস্ট) গণিত বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এবং ছোট বোন নুজহাত-ই-রহমান নেত্রকোনা সরকারি মহিলা কলেজের দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ছেন।
ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় ভীষণ একনিষ্ঠ ছিলেন তানভীর। টাঙ্গাইলের মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে ২০১৭ সালে এসএসসি এবং ২০১৯ সালে এইচএসসি; দুই পরীক্ষাতেই কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। এরপর দেশের শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগে ভর্তি হন।
২০২৫ সালে বুয়েট থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পরপরই, ওই বছরের ১ জুন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন তানভীর। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার ব্যস্ত সূচির মধ্যেই চালিয়ে যান বিসিএসের প্রস্তুতি। আর প্রথম সুযোগেই অর্জন করেন পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হওয়ার বিরল গৌরব।
পার্শ্ববর্তী গ্রামের সৈয়দ শামসুল হক জানান, ‘তানভীর প্রমাণ করেছেন, বড় স্বপ্ন পূরণে অর্থ নয়, প্রয়োজন তীব্র ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায় ও পরিশ্রম। আমরা আশা করি, দেশের পররাষ্ট্র সেবায় দায়িত্ব পালন করে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করবেন।’
কেবল পড়ালেখার টেবিলেই নয়, খেলার মাঠেও সমান পারদর্শী তানভীর। শৈশব থেকেই ফুটবল ও ক্রিকেটের প্রতি তার ছিল দারুণ ঝোঁক। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গোল্ডকাপ টুর্নামেন্টে যখন খেলেন, তখন তার উচ্চতা ছিল মাত্র ৪ ফুটের কিছু বেশি। সবচেয়ে ছোট প্লেয়ার হিসেবে মাঠে নেমেও দেখিয়েছেন নৈপুণ্য। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার জগতেও তানভীরের ঝুলিতে রয়েছে অর্ধশতাধিক পুরস্কার।
ছেলের এই ঐতিহাসিক সাফল্যে আবেগাপ্লুত বাবা আবদুর রহমান বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন। এটি আল্লাহ পাকের অশেষ মেহেরবানি ও সর্বোচ্চ রহমত। মেধাতালিকায় প্রথম হওয়াটা আমাদের পুরো পরিবারের জন্য অত্যন্ত গর্বের। তানভীরের একটা গুণ হলো, সে কখনো ওভার-প্রেডিকশন করে না, সব সময় টু-দি-পয়েন্ট কথা বলে। ক্যাডেট লাইফের ডিসিপ্লিন তাকে অনেক দূর এগিয়ে দিয়েছে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমি সারাজীবন সততার সঙ্গে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করেছি। কোনোদিন অসৎ উপায়ের চিন্তা করিনি। আমার ছেলেকে নিয়ে আজ আমি গর্বিত। তানভীরের প্রতি আমার একটাই দাবি থাকবে, সে যেন রাষ্ট্রের দেওয়া দায়িত্ব যথাযথ যোগ্যতা, দক্ষতা ও শতভাগ সততার সঙ্গে পালন করে। আমাদের যা আছে তাতেই আমরা সন্তুষ্ট, আমি তার কাছ থেকে কোনো আনফেয়ার কিছু আশা করি না।’
তানভীরের এই গৌরবময় সাফল্যে শামছুদ্দিন খান স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং তার গ্রামের সাধারণ মানুষ মিষ্টি বিতরণ করে আনন্দ উদযাপন করছেন। বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের প্রতিনিধিত্ব করতে তানভীর রহমান এখন প্রস্তুত।