একটি পাকা ভবনের আশায় পুরোনো স্কুলঘর নিলামে বিক্রি করে দেওয়ার পর চরম অবকাঠামোগত সংকটে পড়েছে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের লোচনাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নতুন ভবন নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হলেও নানা জটিলতায় শুরু হয়নি নির্মাণকাজ। ফলে শ্রেণিকক্ষের সংকটে পাশের একটি কবরস্থান থেকে টিন এনে কোনোরকমে ছাউনি তৈরি করে সেখানে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষকরা।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন পাকা ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিদ্যালয়ের পুরোনো ভবনটি নিলামে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এরপর নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। এতে বিদ্যালয়টি বর্তমানে প্রায় সম্পূর্ণ অবকাঠামোহীন অবস্থায় রয়েছে।
বিদ্যালয়টির নতুন ভবন নির্মাণের জন্য ২০২৪ সালে প্রায় ১ কোটি ১২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ওই অর্থে দ্বিতল পাকা ভবন নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হলে আব্দুস সোবহান ডাবলু নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি পায়। তবে কার্যাদেশ পাওয়ার পরও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজ শুরু করেনি। বিদ্যালয়ে যাতায়াতের যোগাযোগব্যবস্থা খারাপ হওয়ায় নির্মাণসামগ্রী পরিবহনে ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি গড়িমসি করে। ফলে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে না—এমন পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষ কার্যাদেশটি বাতিল করে দেয়।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জানান, বর্তমানে পাশের কবরস্থানের টিনের ছাউনি স্থানান্তর করে সেখানে শ্রেণিকক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। জরাজীর্ণ ও অনিরাপদ পরিবেশে গাদাগাদি করে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতে হচ্ছে। রোদ-বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ায় দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। এতে একদিকে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও মানসিক স্বস্তিও কমছে। দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
অভিভাবকেরা দ্রুত বিদ্যালয়টিতে নিরাপদ ও উপযোগী শ্রেণিকক্ষ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, শিশুদের শিক্ষার জন্য বিদ্যালয়ে ন্যূনতম নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। একটি পাকা ভবনের আশায় পুরোনো ভবন সরিয়ে নেওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নতুন ভবন নির্মিত না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ বেড়েছে।
শাহজাদপুর উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) রাহাত ইসলাম জানান, বিদ্যালয়টির যোগাযোগব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় নির্মাণসামগ্রী পরিবহনে অতিরিক্ত ব্যয় হওয়ার আশঙ্কা ছিল। এ ছাড়া বিদ্যালয়ের জায়গার স্বল্পতা, পাশে বড় খাল এবং যমুনা নদীর ভাঙনের ঝুঁকিসহ কয়েকটি সমস্যা ছিল। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে না—এমন পরিস্থিতিতে দরপত্র আহ্বানের প্রায় ছয় মাস পর নির্মাণকাজের টেন্ডারটি বাতিল করা হয়। পরে বরাদ্দের অর্থও ফেরত চলে যায়।
তিনি আরও জানান, বিদ্যালয়টি যমুনা নদীর তীরবর্তী এলাকায় হওয়ায় সেখানে বহুতল পাকা ভবন নির্মাণের সুযোগ নিয়েও জটিলতা রয়েছে। এ কারণে নতুন করে বিদ্যালয়টির শ্রেণিকক্ষ নির্মাণে ‘পাইলট ডিজাইন’ অর্থাৎ স্টিলের ফ্রেমের ওপর সেমিপাকা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুরাদ হোসেন ছুটিতে থাকায় মুঠোফোনে জানান, বিদ্যালয়টির ভবন নির্মাণের জন্য আগে একটি দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নির্মাণসামগ্রী পরিবহনসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে সেটি বাতিল হয়েছে। বর্তমানে একটি সেমিপাকা ঘর নির্মাণের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন করে ভবন নির্মাণের জন্য আবেদন করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের দাবি, যমুনার ভাঙন ও যোগাযোগব্যবস্থার বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বিদ্যালয়টির জন্য উপযোগী ও টেকসই অবকাঠামোর ব্যবস্থা দ্রুত করা হোক। এতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠদান স্বাভাবিক হওয়ার পাশাপাশি অভিভাবকদের উদ্বেগও কমবে।







