
দৃশ্যপট অনলাইন
রংপুর ও কুড়িগ্রামের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের মানুষের সুখ-দুঃখ, বিরহ আর যাপনের চিরায়ত সুর ‘ভাওয়াইয়া’। যুগে যুগে এই সুরের ধারা উত্তরবঙ্গের মাটির সোঁদা গন্ধ আর তিস্তা-ধরলার কলতানকে ধারণ করে এসেছে। তবে আধুনিক যন্ত্রসংগীত এবং দ্রুতগতির পপ-রক সংস্কৃতির দাপটে ঐতিহ্যবাহী এই লোকসংগীত একসময় অনেকটাই ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু প্রযুক্তির এই যুগে এসে ভাওয়াইয়ার একটি অপ্রচলিত ও কৌতুকরসের আঞ্চলিক ‘দিছি দিছি হ্যাচাকের বায়না’ গান যেভাবে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা টিকটকের ‘রিলস’ ও ‘শর্টস’-এর দুনিয়ায় আলোড়ন তুলেছে, তা লোকসংগীত গবেষকদের ভাবনার খোরাক হতে পারে।
‘আন্ধারে ধান্ধারে নাচমো না রে দুলাভাই, তোমরা হ্যাচাকের বায়না দেও’-গানটির এই চটুল অথচ ঐতিহ্যবাহী কথা এখন তরুণ প্রজন্মের মুখে মুখে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজার হাজার কনটেন্ট ক্রিয়েটর এই গানের তালে ভিডিও বানাচ্ছেন, যা মুহূর্তেই লাখ লাখ ভিউ পেরিয়ে যাচ্ছে।
ইউটিউবের বেশ কয়েকটি চ্যানেল ঘেঁটে দেখা গেছে, গানটি মূলত উত্তরবঙ্গের গ্রামীণ জনপদের ‘চটকা’ ঘরানার ভাওয়াইয়া গান, যাতে শ্যালক-শ্যালিকা বা দুলাভাইয়ের মধ্যকার সামাজিক খুনসুটি ও কৌতুকরস ফুটে ওঠে। কুড়িগ্রাম জেলার লোকসংস্কৃতির অন্যতম ধারক, ‘চটকা জাদুকর’ হিসেবে পরিচিত শফিকুল ইসলাম (সফি) এই গানের মূল নেপথ্য কারিগর। কুড়িগ্রামের ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পী সফিকুল ইসলাম সফি নিজেই এই গানের গীতিকার, সুরকার ও মূল গায়ক। তার সাথে গানটিতে সহ-শিল্পী হিসেবে কণ্ঠ দিয়েছেন আমেনা খাতুন।
গানের গভীরে লুকিয়ে আছে গ্রামীণ জীবনের এক চিলতে ইতিহাস। গানের মূল শব্দ ‘হ্যাচাক’ বা ‘হ্যাজাক’ হলো এক ধরণের বিশেষ গ্যাসলাইট বা লণ্ঠন, যা অতীতে গ্রামীণ বিয়েশাদি বা মেলা-উৎসবে আলোর প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হতো। গানটিতে শালী তার দুলাভাইকে অন্ধকার রাতে নাচতে অস্বীকৃতি জানিয়ে হ্যাজাক লাইটের অগ্রিম বায়না বা ব্যবস্থা করার দাবি জানাচ্ছে। গ্রামীণ জনপদের এই সরল দাবিটিই গানের কথায় অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী সফি।
বহু বছর ধরে উত্তরবঙ্গ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার ও জলপাইগুড়ি অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামীণ মেলা ও উৎসবের মঞ্চে গানটি গেয়ে আসছিলেন সফিকুল ইসলাম ও আমেনা খাতুন। তবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে গানটির জনপ্রিয়তা মূলত শুরু হয় ২০১৯-২০২০ সালের দিকে ইউটিউবে কিছু লাইভ পারফরম্যান্সের ভিডিও আপলোডের পর থেকে। পরবর্তীতে, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে গানটির ডিজে রিমিক্স এবং গতি বাড়িয়ে তৈরি করা সংস্করণগুলো রিলস ও শর্ট ভিডিও প্ল্যাটফর্মগুলোতে ট্রেন্ড হতে শুরু করে।
বর্তমানে শহুরে তরুণ-তরুণী, যারা ভাওয়াইয়া সংস্কৃতির সাথে পরিচিত নন, তারাও এই গানের চটুল তাল এবং ‘হ্যাচাকের বায়না’ দেওয়ার মতো আদিম গ্রামীণ অনুষঙ্গের প্রতি তীব্র আকর্ষণ অনুভব করছেন।
এটি লোকসংস্কৃতির জন্য একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। তবে চটুল বা কৌতুকরসের গান সহজে ভাইরাল হলেও, ভাওয়াইয়ার মূল গভীর বা করুণ রসের গানগুলো যেন হারিয়ে না যায়, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
শিল্পী শফিকুল ইসলাম সফির চেনা সুর এখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাংলাভাষী নেটিজেনদের বিনোদনের অন্যতম খোরাক। একটি অপ্রচলিত আঞ্চলিক গান যেভাবে আধুনিক যুগের প্রযুক্তির পিঠে চড়ে নতুন প্রজন্মের প্লে-লিস্টে জায়গা করে নিল, তা প্রমাণ করে-মাটির সুরের আবেদন কখনো ফুরিয়ে যায় না, শুধু তার প্রকাশের মাধ্যমটি বদলে যায়।