1. thedailydrishyapat@gmail.com : TheDaily Drishyapat : TheDaily Drishyapat
  2. info@pratidinerdrishyapat.com : Pratidiner Drishyapat : Pratidiner Drishyapat
  3. admin@thedailydrishyapat.com : admin :
শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ০৬:১৩ অপরাহ্ন

চাষের মাছে গন্ধ হয় কেন, কী করলে গন্ধ থাকবে না?

সংবাদ প্রকাশক:
  • Update Time : শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫ Time View

 

 

ন্যাশনাল ডেস্ক 

 

 

 

মাছে-ভাতে বাঙালি’ এই বহুল প্রচলিত প্রবাদটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমাদের বাঙালি জাতিসত্তার এক অবিচ্ছেদ্য পরিচয় বহন করে আসছে। বাঙালির দুপুরের তপ্ত ভাতের পাতে ধোঁয়া ওঠা মাছের ঝোল কিংবা নানা পদের সুস্বাদু রেসিপি থাকবে না, তা যেন ভাবাই যায় না। সময়ের সাথে সাথে নদী-বিলের প্রাকৃতিক মাছের অভাব মেটাতে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বাংলাদেশে কৃত্রিম উপায়ে মাছ চাষের পরিধি ও পরিসর ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ প্রোটিনের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি মাছের উৎপাদন ও রপ্তানি দুই-ই বাড়ছে ইতিবাচক হারে জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশন (এফএও)-এর ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২৬’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাছসহ জলজ প্রাণী উৎপাদনে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে এক অনন্য গৌরব অর্জন করে পঞ্চম স্থানে অবস্থান করছে।

 

 

 

কিন্তু এই বিপুল সাফল্যের মাঝেও এক অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা আমাদের প্রায় সবারই হচ্ছে। তাজা দেখে বাজার থেকে সাধের রুই, কাতলা, পাঙাশ বা শিং মাছ কিনে আনার পর ঘরে যখন তা কাটা ও ধোয়া হয়, কিংবা রান্নার সময় নাকে এসে লাগে এক অদ্ভুত কাদা-কাদা বা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। অনেক গৃহিণীই অভিযোগ করেন, লেবু, লবণ, হলুদ কিংবা আদা-রসুন দিয়ে বারংবার ধুয়েও মাছে জমে থাকা এই দুর্গন্ধ পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয় না। খেতে বসেও সেই একই কাদাটে স্বাদের কারণে পুরো খাবারের তৃপ্তিই যেন মাটি হয়ে যায়।

 

 

 

সম্প্রতি বিবিসি নিউজ বাংলার একটি বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাষের মাছে এই অনাকাঙ্ক্ষিত গন্ধের আসল বৈজ্ঞানিক কারণ এবং এটি দূর করার জন্য বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত অত্যন্ত কার্যকর ও জাদুকরী সমাধান।

 

 

চাষের মাছে দুর্গন্ধের আসল রহস্য: কী বলে বিজ্ঞান?

 

 

 

অনেকে মনে করেন চাষের মাছ কাদা বা নোংরা আবর্জনা খায় বলে এমন গন্ধ হয়। তবে আসল কারণটি লুকিয়ে রয়েছে অণুজীবের জগতে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহফুজুল হক বিষয়টির নিখুঁত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, পুকুর বা জলাশয়ের বদ্ধ পানি দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করার কারণে সেখানে প্রধানত তিন ধরনের ব্যাকটেরিয়া বিপুল পরিমাণে তৈরি হয়। একজিনো ব্যাকটেরিয়া, মিকজো ব্যাকটেরিয়া এবংসায়ানো ব্যাকটেরিয়া। এই ব্যাকটেরিয়াগুলোর জীবনপ্রক্রিয়া থেকে নিঃসৃত হয় দুই ধরনের ক্ষতিকর জৈব রাসায়নিক যৌগ—জিওসমিন এবং ২-মিথাইলআইসোবোর্নিওল।

 

 

 

এই দুটি রাসায়নিক যৌগের কারণেই মূলত মাছে সেই তীব্র স্যাঁতসেঁতে ও কাদাটে গন্ধের সৃষ্টি হয়। অধ্যাপক হক আরও জানান, মাছের শরীরে চর্বি যেখানে থাকে অথবা মাছের দেহের উপরিভাগের চামড়া, যেখানে লাল মাংসপেশী (রেড মাসেল) আছে, সেসব জায়গায় জমে এই দুর্গন্ধটা তৈরি হয়।

 

 

ব্যাকটেরিয়ার বাড়বাড়ন্ত: যেখানে আমাদের গলদ

 

 

গবেষকদের মতে, চাষের পুকুরগুলোতে এই ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও রাসায়নিক যৌগ অবাধে বেড়ে ওঠার পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ বা অনিয়ম দায়ী:

 

 

 

অতিরিক্ত খাদ্য সরবরাহ: অধিক ও দ্রুত উৎপাদনের আশায় মৎস্য চাষিরা প্রায়শই পুকুরে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কৃত্রিম খাবার দেন। এই বাড়তি খাবার পানির নিচে পচে ব্যাকটেরিয়ার উর্বর প্রজননক্ষেত্র তৈরি করে।

 

অতিরিক্ত ঘনত্ব: পুকুরের স্বাভাবিক ধারণক্ষমতার বা আকারের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে মাছ মজুদ করা হয়।

 

পানি পরিবর্তন না করা: বদ্ধ জলাশয়ের পুরোনো পানি নিয়মিত পরিবর্তন না করা ব্যাকটেরিয়া বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ।

 

 

অধ্যাপক মাহফুজুল হকের মতে, আমাদের দেশের গ্রামীণ এলাকায় অসংখ্য পুকুর থাকলেও অনেক জায়গায় পুরোনো পানি বের করে নতুন পানি দেওয়ার প্রয়োজনীয় নিষ্কাশন ব্যবস্থা বা সুযোগ নেই। আবার অনেক চাষি বাড়তি খরচের ভয়েও পানি পরিবর্তন করার পদক্ষেপ নেন না। এই ধরনের উদাসীনতাকে তিনি “অ্যাকুয়াকালচার ভায়োলেন্স” বা মৎস্য চাষের ক্ষেত্রে এক প্রকার সহিংসতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মাঠপর্যায়ে চাষিরা মাছ চাষের এই আদর্শ নিয়ম বা স্ট্যান্ডার্ড প্রোটোকলগুলো সঠিকভাবে মানছেন কি না, তা পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এছাড়াও, নিয়মিত পুকুর পরিষ্কার না করার ফলে সেখানে ক্ষতিকারক ভারী ধাতু জমা হতে থাকে।

 

 

গবেষকদের পরামর্শ অনুযায়ী, অন্তত প্রতি তিন বছর পর পর পুকুরের তলদেশ পরিষ্কার করা উচিত। কারণ একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু চাষের মৃগেল মাছে কিডনি ও যকৃতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ভারী ধাতু ‘ক্রোমিয়ামের’ মাত্রা নিরাপদ সীমার চেয়ে প্রায় চার গুণ বেশি পাওয়া গিয়েছিল! জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশন (এফএও) বলছে, খাবারে ক্রোমিয়াম দশমিক ১৫ মিলিগ্রাম পর্যন্ত সহনীয়, এর বেশি হলে তা মানবদেহের কিডনি ও যকৃতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে।

 

 

স্বাস্থ্যঝুঁকি ও খাবারের অতৃপ্তি

 

 

মাছের এই তীব্র গন্ধ আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য সরাসরি কতটা ক্ষতিকর? অধ্যাপক হক এই বিষয়ে কিছুটা আশ্বস্ত করে জানান যে, বাংলাদেশে আমরা সাধারণত কাঁচা বা আধা-সিদ্ধ মাছ খাই না। মাছকে খুব ভালোভাবে রান্না করার ফলে এর স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকাংশেই কমে যায়। তবে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমলেও, অতিরিক্ত গন্ধের কারণে মাছ খাওয়ার যে আসল স্বাদ এবং পরম তৃপ্তি—তা অনেকটাই কমে যায়।

 

 

মুশকিল আসান: দুর্গন্ধহীন মাছ চাষের জাদুকরী প্রযুক্তি ‘বটম ক্লিন অ্যাকুয়াকালচার’

 

 

বাঙালির পাতে আবার আগের মতো সুস্বাদু ও সুগন্ধযুক্ত মাছ ফিরিয়ে দিতে মৎস্য বিজ্ঞানীরা এক চমৎকার পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির উদ্ভাবন করেছেন, যার নাম ‘বটম ক্লিন অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম’।

 

 

এই প্রকল্পের প্রধান গবেষক মো. মনিরুজ্জামান জানান, এই প্রযুক্তিতে কোনো প্রকার কৃত্রিম রাসায়নিক ওষুধ ব্যবহার ছাড়াই সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে মাছের দ্রুত বৃদ্ধির পাশাপাশি এর গন্ধ, স্বাদ এবং মান চমৎকার রাখা সম্ভব।

 

 

 

তলদেশ পরিষ্কার ও অক্সিজেন সরবরাহ: এই পদ্ধতিতে ট্যাংকের বা জলাধারের তলদেশ সবসময় পরিষ্কার রাখা হয়। পাশাপাশি একটি শক্তিশালী ‘এয়ার ব্লোয়ার’-এর সাহায্যে পানিতে সবসময় অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়।

 

চাপমুক্ত মাছ ও দ্রুত বৃদ্ধি: পানিতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন থাকায় মাছ যেকোনো মানসিক চাপ বা ‘স্ট্রেস’ থেকে মুক্ত থাকে এবং অতি দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

 

অবিশ্বাস্য সময় সাশ্রয়: সাধারণ পদ্ধতিতে যে ক্যাটফিশ বা শিং মাছ চাষ করতে প্রায় ৭ মাস সময় লাগে, এই বটম ক্লিন প্রযুক্তিতে মাত্র ১২০ দিনেই (৪ মাস) কোনো ওষুধ ছাড়াই তা পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় ও আহরণের উপযোগী হয়।

 

অধিক উৎপাদন: খুব কম জায়গায় এই প্রযুক্তিতে অধিক উৎপাদন সম্ভব। যেমন—শিং মাছের ক্ষেত্রে প্রতি ট্যাংকে ৮০ থেকে সর্বোচ্চ ১৩০ কেজি পর্যন্ত সর্বোচ্চ উৎপাদন পাওয়া গেছে।

 

 

সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয় হলো, এই পদ্ধতিতে উৎপাদিত মাছে কোনো ধরনের কাদা বা স্যাঁতসেঁতে দুর্গন্ধ থাকে না, মাছের গায়ের রঙ অত্যন্ত উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয় হয় এবং স্বাদ হয় চমৎকার। ইতিমধ্যে এই প্রযুক্তির সাহায্যে টেংরা, গুলশা, পাবদা ও শিং মাছ চাষ করে ব্যাপক সফলতা পাওয়া গেছে।

 

 

ছাদেই হবে দুর্গন্ধহীন মাছের চাষ!

 

 

বিজ্ঞানীদের দাবি, এই ‘বটম ক্লিন অ্যাকুয়াকালচার’ প্রযুক্তির পরিচালন খরচ অত্যন্ত কম এবং এটি পরিচালনা করাও বেশ সহজ। এর ফলে শুধু বাণিজ্যিক খামারেই নয়, বরং ঢাকা বা যেকোনো শহরের বাড়ির ছাদে একটি শেডের ভেতরে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে নিজেদের খাওয়ার জন্য শতভাগ গন্ধহীন ও তাজা মাছ উৎপাদন করা সম্ভব!

 

 

খুব শীঘ্রই মৎস্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে এই চমৎকার আধুনিক চাষ পদ্ধতি মাঠপর্যায়ের মৎস্য চাষি এবং নতুন উদ্যোক্তাদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন গবেষকরা। আশা করা যায়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই মেলবন্ধনে বাঙালির পাতের মাছ আবার তার হারিয়ে যাওয়া সুবাস ও অমৃত স্বাদ ফিরে পাবে।

 

 

তথ্যসূত্র: বিবিসি

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
প্রতিদিনের দৃশ্যপট ২০২৪
Theme Customized BY Kh Raad (FriliX Group)
Raytahost Facebook Sharing Powered By : Raytahost.com