প্রশাসনিক রূপান্তরের জটিলতায় ঠাকুরগাঁওয়ের নবগঠিত ভূল্লী এলাকায় জমির নামজারি বা খারিজ (ই-মিউটেশন) কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। নতুন উপজেলা ঘোষণার পর ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা সিস্টেমে প্রশাসনিক সীমানা নির্ধারণ, বালাম বইয়ের রেকর্ড পৃথকীকরণ ও অনলাইন সার্ভার সমন্বয়ে জটিলতার কারণে মাসের পর মাস ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ সেবাগ্রহীতারা।
নামজারি করতে না পারায় জমি কেনাবেচা, ব্যাংক ঋণ গ্রহণ এবং উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির বণ্টনসহ বিভিন্ন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে ভূল্লী এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষ হয়রানি ও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় ভুক্তভোগী ও দলিল লেখকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভূল্লী উপজেলা গঠনের আগে এ এলাকার ইউনিয়নগুলো ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা ভূমি অফিসের অধীনে পরিচালিত হতো। নতুন উপজেলা ঘোষণার পর ভূমি ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত তথ্য নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয়ের কার্যক্রম শুরু হয়।
তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নতুন ভূমি অফিসের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম ও জনবল কাঠামো গড়ে না ওঠায় সমস্যা আরও জটিল হয়েছে। সরকারি ‘স্মার্ট ভূমি সেবা’ পোর্টালে নামজারির আবেদন করতে গিয়ে অনেক সময় ভূল্লী এলাকার মৌজাগুলো সঠিকভাবে প্রদর্শিত হচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে বেশ কিছু আবেদন সদর উপজেলা ও ভূল্লী ভূমি অফিসের মধ্যে আটকে আছে বলে জানান ভুক্তভোগীরা।
নামজারি না হওয়ায় জমি বিক্রি করতে পারছেন না অনেকেই। কেউ কেউ চিকিৎসা বা সন্তানের পড়াশোনার মতো জরুরি প্রয়োজনে জমি বিক্রি করতে চাইলেও তা সম্ভব হচ্ছে না। আবার কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অনেকে জমি বন্ধক রেখে ব্যাংক ঋণ নিতে গিয়ে হালনাগাদ নামজারি ও পর্চা না থাকায় ঋণ পাচ্ছেন না।
এদিকে প্রশাসনিক জটিলতার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী ও দালাল সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। সার্ভারের জটিলতা দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়ে তারা সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
ভূল্লী বাজারের একাধিক সেবাগ্রহীতা বলেন, উপজেলা ঘোষণার পর তারা আশা করেছিলেন সরকারি সেবা আরও সহজলভ্য হবে। কিন্তু জমির নামজারি করতে গিয়ে সদর ও ভূল্লী ভূমি অফিসে বারবার যেতে হচ্ছে। দ্রুত এ সমস্যার সমাধান করে নিয়মিত ভূমিসেবা চালুর দাবি জানান তারা।
হাসান নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, “জমির নামজারি বন্ধ থাকায় আমি জমি বিক্রি করতে পারছি না। জরুরি প্রয়োজনে আমার টাকার দরকার। দ্রুত এ সমস্যার সমাধান চাই।”
ভূল্লী সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের দলিল লেখক বাবুল বলেন, “নামজারি বন্ধ থাকায় দলিল সম্পাদনের সংখ্যা কমে গেছে। এতে আমরাও সমস্যায় পড়েছি। দ্রুত এর সমাধান প্রয়োজন।”
ভূল্লী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাদ্দাম হোসেন বলেন, “নতুন উপজেলা হিসেবে প্রশাসনিক কার্যক্রম পুরোপুরি চালু করতে কিছুটা সময় লাগছে। ভূমিসেবা নিয়ে যে সমস্যাগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলো সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হন এবং দ্রুত নামজারি সেবা পান, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, কোনো দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ লেনদেন না করে সরাসরি সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস থেকে সেবা নিতে হবে।
জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট এক রাজস্ব কর্মকর্তা বলেন, “নতুন উপজেলা ঘোষণার পর ডিজিটাল ডাটাবেজ স্থানান্তর ও বালাম বইয়ের রেকর্ড পৃথকীকরণে কারিগরি কিছু সময় লাগে। ভূল্লী এলাকার মানুষের ভোগান্তির বিষয়টি আমরা অবগত আছি। ভূমি মন্ত্রণালয়ের আইসিটি বিভাগের সহায়তায় সার্ভার জটিলতা নিরসন করে দ্রুত নিরবচ্ছিন্ন ভূমিসেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”







