
দৃশ্যপট ডেস্ক রিপোর্টঃ
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলায় জমে উঠেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মৌসুমি ফল তালের শাঁসের ব্যবসা। খোলা আকাশের নিচে রাস্তার মোড়, ফুটপাত ও হাটবাজারজুড়ে বসছে তালের শাঁসের অস্থায়ী দোকান। গরমের এই সময়ে সুস্বাদু ও শীতল এ ফল কিনতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন সব বয়সী মানুষ।
উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের হাটবাজার ও গুরুত্বপূর্ণ জনবসতি এলাকায় প্রতিদিন কাঁচা তাল নিয়ে বসছেন ব্যবসায়ীরা। প্রতি পিস তালের শাঁস বিক্রি হচ্ছে ৫ থেকে ১০ টাকায়। জ্যৈষ্ঠ্য ও আষাঢ় মাসে নানা ধরনের মৌসুমি ফলের মধ্যে তালের শাঁস অন্যতম জনপ্রিয়। গ্রামাঞ্চলে এটি ‘তালকুর’ বা ‘তালের শাঁস’ নামেও পরিচিত।
প্রচণ্ড গরমে তালের নরম ও রসালো শাঁস শরীরকে শীতল রাখার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতেও সহায়ক বলে মনে করেন অনেকে।
রবিউল নামে এক ক্রেতা বলেন, “আগের মতো এখন আর তাল পাওয়া যায় না। আগে রাস্তার পাশে তালের রস বিক্রি হতে দেখা যেত, এখন সেটি প্রায় বিলুপ্ত। বর্তমানে কাঁচা তালের শাঁস খাচ্ছি, কিন্তু কিছুদিন পর এটিও হয়তো পাওয়া যাবে না। যেভাবে তালগাছ কাটা হচ্ছে, তাতে একসময় তালগাছ শূন্য হয়ে পড়বে।”
তিনি আরও বলেন, “আগে ২০ থেকে ৩০ টাকায় এক হালি তাল পাওয়া যেত, এখন প্রকারভেদে ৮০ থেকে ১০০ টাকা লাগছে।”
তালের শাঁস কিনতে আসা সোহেল রানা ও মিনা পারভীন বলেন, “তাল একটি সুস্বাদু ও উপকারী মৌসুমি ফল। কিন্তু তালগাছ কমে যাওয়ায় আগের তুলনায় দাম বেড়েছে। গ্রামীণ ঐতিহ্য রক্ষা ও তালের স্বাদ ধরে রাখতে সরকারিভাবে তালগাছ রোপণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।”
মৌসুমি ফল বিক্রেতা রফিক মিয়া জানান, তিনি চার বছর ধরে তালের শাঁস বিক্রি করছেন। স্থানীয়ভাবে কাঁচা তাল কম পাওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে সংগ্রহ করতে হয়। ফলে দামও বেশি পড়ে। তবে এ বছর ব্যবসা ভালো হলেও তালের দাম বেশি এবং সরবরাহ কম।
এক যুগ ধরে তালের শাঁস বিক্রি করা ছানোয়ার হোসেন বলেন, “আগে এক ছড়া কাঁচা তাল ৫০ থেকে ১০০ টাকায় পাওয়া যেত। এখন সেই ছড়া কিনতে হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়। আগে একটি তালগাছের কাঁচা তাল ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় কিনলেও এখন গুনতে হচ্ছে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা। পরিবহন ও অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে।”
বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশন (বিবিসিএফ) উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিরাজগঞ্জ জেলা শাখার আহ্বায়ক দীপক কুমার কর বলেন, “তালগাছ শুধু ফলের উৎস নয়, বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই পরিবেশ রক্ষা ও মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে তালগাছ সংরক্ষণ এখন সময়ের দাবি।”
রায়গঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মমিনুল হক বলেন, “তালের শাঁস যেমন সুস্বাদু, তেমনি পুষ্টিকর। তালের রস দিয়ে গুড়সহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি হয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত কারণে দিন দিন তালগাছ কমে যাচ্ছে।”
তিনি জানান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বজ্রপাত সহনশীল গাছ হিসেবে তালগাছের চারা রোপণের কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কৃষি বিভাগও মানুষকে বেশি বেশি তালগাছ লাগাতে উদ্বুদ্ধ করছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, গ্রামাঞ্চলে অনেকেই তালগাছের গুরুত্ব অনুধাবন না করে নির্বিচারে গাছ কেটে ফেলছেন। বছরে মাত্র একবার ফলন হওয়া এবং তুলনামূলক কম আর্থিক লাভের কারণে তালগাছ সংরক্ষণে আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেকে।