
অনলাইন ডেস্ক
ফল খাওয়া নিয়ে বাংলা ভাষায় একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ আছে ‘খালি পেটে জল আর ভরা পেটে ফল।’ অর্থাৎ ফল খেতে হবে ভরা পেটে। কিন্তু আধুনিক গবেষণা বলছে এ প্রবাদ সম্পূর্ণ সঠিক নয়। তবে খালি পেটে পানি খাওয়ার অনেক উপকারিতা থাকলেও ফল খাওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই।
সকালবেলা খালি পেটে ফল খাওয়া যাবে কি যাবে না, এ নিয়ে নানা মতবিরোধ রয়েছে। এমনকী সকালে খালি পেটে ফল খেলে উপকারের চেয়ে অপকারিতা বেশি বলেও প্রচলিত আছে। আসলেই কি তাই?
আমাদের ঘুম ভাঙার পরে ব্লাড সেল এবং ব্রেন সেলকে পুনরায় সক্রিয় করতে প্রয়োজন হয় প্রচুর প্রাকৃতিক শর্করার। আর এ কারণেই খালি পেটে ফল খাওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। এতে করে শরীরে চিনির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কাও কমে। ফলে দূরে থাকা যায় ডায়াবেটিস থেকে।
নিয়মিত খালি পেটে ফল খেলে শরীরে উপকারী ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন এবং মিনারেলের মাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে, যা খারাপ কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমানোর পাশাপাশি ব্লাড প্রেসারকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। ফলে হার্টের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা কমে। তাই সুস্থ থাকতে সকালের নাস্তায় নিয়মিত ফল রাখুন।
সকালের নাস্তা খাওয়ার আগে ভিটামিন সি যুক্ত ফল খেলে আমাদের শরীর খাবারে থাকা পুষ্টিকর উপাদানগুলো বেশি মাত্রায় গ্রহণ করতে পারে। এতে শরীরের ভেতরকার পুষ্টির ঘাটতি দূর হয়। এর পাশাপাশি অ্যানিমিয়ার আশঙ্কাও হ্রাস পায়।
তবে আমেদের মাঝে ফল খাওয়ার সঠিক বা ভুল সময় নিয়ে অনেক ধরনের ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। আসলে যেকোনো সময় ফল খাওয়া স্বাস্থ্যকর। ফল খাওয়ার নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই।
ফল খাওয়া নিয়ে প্রচলিত শীর্ষ পাঁচটি ভুল ধারণা এবং তার সত্যতা তুলে ধরা হলো-
খালি পেটে ফল খাওয়া উচিত নয়
অনেকেই মনে করেন খালি পেটে ফল খাওয়া উপকারী নয়। এটি ভুল ধারণা। সকালে ফল খাওয়ার অনেক উপকারিতা রয়েছে তবে সব ফল খেলে সমান পুষ্টিগুণ পাওয়া যায় না। ফল না খেলে তা হজমে বাধা দেয় এবং পেটে পচে গ্যাস বা অস্বস্তি তৈরি করে। ফলের ফাইবার হজমের গতি কিছুটা ধীর করলেও খাবারকে পেটে পচিয়ে ফেলার মতো কোনো ঘটনা ঘটে না।
খাবার খাওয়ার আগে বা পরে ফল খেলে পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়
ধারণা করা হয় যে খাবারের ঠিক আগে বা পরে ফল খেলে তার পুষ্টি পাওয়া যায় না। এটি ভুল। আমাদের পরিপাকতন্ত্র এবং ক্ষুদ্রান্ত্র যেকোনো খাবার থেকে পুষ্টি শুষে নিতে অত্যন্ত পারদর্শী। তাই আপনি কখন ফল খাচ্ছেন তাতে পুষ্টি শুষে নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হয় না। আপনার হজম শক্তি কতটা তার উপর নির্ভর করে ফল খাওয়ার আসল পুষ্টিগুণ।
ডায়াবেটিস থাকলে খাবার খাওয়ার ১-২ ঘণ্টা আগে বা পরে ফল খাওয়া উচিত
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য শুধু ফল খাওয়া ক্ষতিকর হতে পারে, কারণ এতে রক্তের শর্করা দ্রুত বেড়ে যায়। বরং ফলের সাথে প্রোটিন, ফাইবার বা চর্বিজাতীয় খাবারের সাথে মিশিয়ে খেলে শর্করা রক্তে ধীরে প্রবেশ করে, যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
ফল খাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় হলো সকালবেলা
সকালে ফল খেলে তা হজমতন্ত্রকে ‘জাগিয়ে তোলে’ বা বিশেষ কোনো উপকার করে এমন কোনো প্রমাণ নেই। আপনার জিব্বা যখনই খাবারে স্পর্শ করে, তখনই হজমতন্ত্র কাজ শুরু করতে প্রস্তুত থাকে। যেকোনো সময় ফল খাওয়া সমানভাবে উপকারী।
দুপুর ২টার পর ফল খাওয়া উচিত নয়
কোনো কোনো ডায়েট প্ল্যানে দুপুর ২টার পর ফল বা শর্করা জাতীয় খাবার খেতে নিষেধ করা হয় এই বলে যে এটি ওজন বাড়ায়। কিন্তু বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিকেল বা রাতের দিকে শর্করা রক্তে বেশি শর্করার মাত্রা বাড়াবে এমন কোনো প্রমাণ নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের একাডেমিক মেডিকেল সায়েন্সবিষয়ক ওয়েবসাইট এমডিলিংক্সও খালি পেটে ফল খেলে বেশি পুষ্টিগুণ পাওয়ার ধারণাটিকে প্রচলিত ধারণা হিসেবে উল্লেখ করেছে। এমডিলিংক্স জানায়, ফল খালি পেটে খাওয়া হোক বা ভরা পেটে, সেটির পুষ্টিগুণ একই থাকে। অন্যান্য খাবারের সঙ্গে ফল খাওয়া অথবা খাবারের পর ফল খাওয়া স্বাস্থ্যের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না। তবে এটি সত্য, খালি পেটে ফল খেলে সেটি দ্রুত হজম হয়ে যায়।
ফল খাওয়ার সঠিক নিয়ম
খাবারের ক্রম নয়, সুষম খাদ্যাভ্যাস জরুরি। ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে সাধারণত সবজি, প্রোটিন ও চর্বির পর ফল খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। মূল বিষয় হলো, কার্বোহাইড্রেট বা ফল একা না খেয়ে তার সঙ্গে প্রোটিন বা স্বাস্থ্যকর চর্বি রাখা।
পুষ্টিবিদ এলিজাবেথ জানান, কোনো নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যা না থাকলে সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে খাবারের কোন অংশ আগে বা পরে খাওয়া হলো, তা পুষ্টি শোষণে বড় কোনো প্রভাব ফেলে না। তাই যেকোনো সময় বা নাশতায় নিজের পছন্দমতো ফল খাওয়া যায়।
বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে সময়ের গুরুত্ব
বেশিরভাগ মানুষের জন্য যেকোনো সময় ফল খাওয়া নিরাপদ হলেও বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে সামান্য সতর্কতা জরুরি-
ডায়াবেটিস রোগিদের খালি ফল খাওয়ার বদলে প্রোটিন, ফাইবার বা ফ্যাটযুক্ত খাবারের সাথে ফল খেলে রক্তের শর্করা হঠাৎ বেশি বাড়ে না। আবার যাদের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হয় তাদের সকালবেলা ফল বা বেশি শর্করা জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলাই ভালো। কারণ এ সময় অনেকের সকালে রক্তের শর্করার মাত্রা বেশি থাকে। সারাদিন ধরে অল্প অল্প করে খাবার খাওয়া এখানে বেশি কার্যকর।
সুতরাং, ফল খাওয়ার নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। তাই সময়ভেদে ফল খেলে এর পুষ্টিগুণেও কোনো তারতম্য হয় না; বরং যেকোনো সময়েই ফল খাওয়া যায়।তবে খাওয়ার আগে অবশ্যই ফল ধুয়ে নিতে হবে।
সূত্র: হেলথ লাইন