
ন্যাশনাল ডেস্ক
আগ্নেয়গিরি থেকে উত্তপ্ত লাভা, ছাই এবং ধোঁয়া বেরোনোর কথা সবাই জানেন। কিন্তু স্বর্ণ? দুর্মূল্য সেই ধাতুও বের হচ্ছে আগ্নেয়গিরি থেকে। দু-এক গ্রাম নয়, প্রতিদিন অন্তত ৮০ গ্রাম।
এন্টার্কটিকার দক্ষিণে রস সমুদ্রের ভেতরে রস দ্বীপে রয়েছে মাউন্ট এরেবাস আগ্নেয়গিরি। ভৌগোলিকভাবে চিহ্নিত পৃথিবীর দক্ষিণ মেরু থেকেও আরও ১ হাজার ৩৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এটি। মাউন্ট এরেবাসকে পৃথিবীর দক্ষিণতম প্রান্তের সক্রিয় আগ্নেয়গিরি বলা হয়। বরফের মধ্যে থেকেও এই পাহাড়কে ঘিরে রয়েছে ফুটন্ত লাভার হ্রদ। সেখানেই পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল থেকে প্রতিদিন বেরিয়ে আসছে স্বর্ণ। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, একেবারে নিখাদ খাঁটি স্বর্ণ।
যে কোনো সক্রিয় আগ্নেয়গিরি থেকেই প্রায় অনবরত গ্যাস, ধোঁয়া, ধুলো এবং লাভা বেরোতে থাকে। মাউন্ট এরেবাসের গ্যাসের মধ্যে স্ফটিকাকার মৌলিক স্বর্ণের অতিসূক্ষ্ম কণাগুলো বিজ্ঞানীদের বহু দিন ধরে ভাবাচ্ছে। আগ্নেয়গিরিটি নিয়ে গবেষণা হয়েছিল ১৯৯১ সালে। তার ফল ‘জিয়োফিজিক্যাল রিসার্চ লেটারস’ নামে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সেখানেই প্রথম বলা হয়েছিল, দিনে ৮০ গ্রাম করে স্বর্ণ উগরে দেয় এরেবাস। আণুবীক্ষণিক সেই স্বর্ণকণা অন্তত এক হাজার কিলোমিটার দূরে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে, লেগে থাকে বরফের গায়ে।
তবে আগ্নেয়গিরি থেকে স্বর্ণ নিঃসরণ নতুন কিছু নয়। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের কিলাউয়েয়া কিংবা ইতালির এটনা, আলাস্কার অগাস্টিন কিংবা মেক্সিকোর এল শিশন আগ্নেয়গিরি থেকে নিঃসৃত পদার্থেও স্বর্ণের খোঁজ মিলেছে। সেখান থেকে প্রতিদিন আরও বেশি স্বর্ণ নির্গত হয়। তবে মাউন্ট এরেবাসের আলাদা বিশেষত্ব রয়েছে। এর আগে কখনো কোনো আগ্নেয়গিরি থেকে স্ফটিকাকারে মৌলিক স্বর্ণের কণা বেরোতে দেখা যায়নি। কীভাবে তা উত্তপ্ত ম্যাগমার স্তর পেরিয়ে অক্ষত অবস্থায় বাইরে আসছে, সেটাই রহস্য। বিজ্ঞানীরা এর একাধিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তবে একমত হতে পারেননি কেউ।
আমেরিকার নিউ মেক্সিকো ইনস্টিটিউট অব মাইনিং অ্যান্ড টেকনোলজির ভূ-রসায়নবিদ কিম্বারলি মিকার এবং তার দলের মতে, এরেবাসে স্বর্ণ এমন আচরণ করছে, যা অন্য কোথাও দেখা যায় না। এই গবেষকদলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য এরেবাসের জ্বালামুখের চারপাশের বরফ, লাভা হ্রদ থেকে ওঠা গ্যাসের কুণ্ডলী এবং আগ্নেয়গিরি থেকে এক হাজার কিলোমিটার দূরে এন্টার্কটিকার ট্রপোস্ফিয়ার থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন। তিনটি ক্ষেত্রেই নমুনায় স্বর্ণের ক্ষুদ্র কণা পাওয়া গেছে।
গবেষকদের একটি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, লাভার সঙ্গে বেরিয়ে আসা ক্লোরিনযুক্ত যৌগের মাধ্যমে স্বর্ণ বাইরে আসে। তারপর গ্যাস ঠান্ডা হলে স্বর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শেষমেশ এন্টার্কটিকার সুবিস্তৃত বরফের গায়ে জমা হতে থাকে।
নিউ মেক্সিকো ইনস্টিটিউট অব মাইনিং অ্যান্ড টেকনোলজির আগ্নেয়গিরি বিশেষজ্ঞ ফিলিপ কাইল পরে আরেকটি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। ১৯৯১ সালের গবেষকদলের সদস্য ছিলেন তিনি। তার মতে, লাভা হ্রদের ওপরের স্তরে স্বর্ণ ধীরে ধীরে জমা হয়। তারপর গ্যাসের সঙ্গে অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে। এই তত্ত্বের সঙ্গেও সবাই পুরোপুরি একমত হতে পারেননি। ৩০ বছর ধরে তাই রহস্যের নাম মাউন্ট এরেবাস। এখনো সমাধান খুঁজে চলেছেন বিজ্ঞানীরা।
সূত্র: আনন্দবাজার