
পলাশ চন্দ্র সরকার,মান্দা (নওগাঁ) প্রতিনিধি
জরাজীর্ণ ভবন, কোথাও নেই নিজস্ব অবকাঠামো। এর সঙ্গে রয়েছে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও জনবলসংকট। সব মিলিয়ে নওগাঁর মান্দা উপজেলার উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে ব্যাহত হচ্ছে গ্রামীণ মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা। চিকিৎসক না থাকায় এবং প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে এসব কেন্দ্রে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। ফলে চিকিৎসা নিতে অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কিংবা বেসরকারি হাসপাতালের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে তাঁদের।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, মান্দা উপজেলায় উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র রয়েছে নয়টি। এর মধ্যে খাসমান্দা, মান্দা সদর ইউনিয়নের কালিকাপুর, জোতবাজার ও কালিগ্রাম উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের নিজস্ব ভবন রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় ভবনগুলোর অবস্থা অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই টিনের ছাউনি দিয়ে পানি পড়ে ভিজে যায় কক্ষের ভেতর। এমন পরিবেশে চিকিৎসাসেবা দেওয়া যেমন কঠিন, তেমনি রোগীদেরও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
অন্যদিকে বাকি পাঁচটি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের নিজস্ব কোনো ভবন নেই। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের ভবনে কোনোমতে পরিচালিত হচ্ছে এসব কেন্দ্রের কার্যক্রম। নিজস্ব অবকাঠামো না থাকায় স্বাভাবিকভাবে সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
শুধু অবকাঠামো নয়, জনবলসংকটও প্রকট। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, প্রতিটি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে একজন এমবিবিএস চিকিৎসক, একজন মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট, একজন ফার্মাসিস্ট, একজন মিডওয়াইফ ও একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী থাকার কথা। সেই হিসাবে নয়টি কেন্দ্রে মোট পদ রয়েছে ৪৫টি। কিন্তু বর্তমানে কোনো উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রেই এমবিবিএস চিকিৎসক নেই। সব মিলিয়ে কর্মরত আছেন মাত্র ১৫ জন। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় জনবলের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ দিয়ে চলছে এসব কেন্দ্রের কার্যক্রম।
সরেজমিনে কয়েকটি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র ঘুরে চিকিৎসাসেবার এমন চিত্র দেখা গেছে। উপজেলার জোতবাজার উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ময়নুল হাসান বলেন, ভবনটির অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। টিনের ছাউনি পুরোনো হওয়ায় অধিকাংশ জায়গায় ফুটো হয়ে গেছে। বৃষ্টি হলে কক্ষের ভেতর পানি পড়ে। এতে ওষুধসহ প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র সংরক্ষণ করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, এ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রতিদিন ১০০ জনের বেশি রোগী সেবা নিতে আসেন। পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকায় তাঁকেই কেন্দ্রের তালা খুলে ঝাড়ু দিতে হয়। এরপর রোগীদের নাম-ঠিকানা ও রোগের বিবরণ রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করে ওষুধ বিতরণ করতে হিমশিম খেতে হয়। বর্তমানে এ কেন্দ্রে তিনি ও একজন মিডওয়াইফ দায়িত্ব পালন করছেন।
খাসমান্দা উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ফার্মাসিস্ট মোজাম্মেল হক বলেন, প্রতিদিন এ কেন্দ্রে ৮০ জনের বেশি রোগীকে সেবা দিতে হয়। কিন্তু ওষুধ সরবরাহের তুলনায় রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় মাসের ১৮ থেকে ২০ দিনের মধ্যেই ওষুধ শেষ হয়ে যায়। ফলে পরবর্তী সময়ে সেবা নিতে আসা রোগীদের নানা মন্তব্য শুনতে হয়।
তিনি আরও বলেন, এ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তিনি একাই দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে তাঁকে অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হচ্ছে। ভবনটির অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। ঝুঁকি নিয়েই সেখানে কাজ করতে হচ্ছে।
কোমরব্যথা, জ্বর ও কাশি নিয়ে খাসমান্দা উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন ষাটোর্ধ্ব ময়না বেগম। এসব সমস্যার জন্য তাঁকে শুধু প্যারাসিটামল, হিস্টাসিন ও ওমিপ্রাজল দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পাওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।
খাসমান্দা বাজারের বাসিন্দা সুফল কুমার বলেন, অবকাঠামো ও জনবলসংকটের কারণে গ্রামের মানুষ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ এবং শূন্য পদগুলোতে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহবুব-উল আলম বলেন, জনবলসংকট ও পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ না থাকায় গ্রামীণ জনপদে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। এরপরও কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে। নতুন ভবন নির্মাণের জন্য চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলেই নির্মাণকাজ শুরু হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয়সংখ্যক চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগ দেওয়া হলে এ সমস্যার সমাধান হবে।