
স্বাস্থ্য ডেস্ক।
মাতৃত্ব পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর ও অনুভূতির এক অভিজ্ঞতা হলেও, এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে নতুন মায়েদের শারীরিক ও মানসিক নানা পরিবর্তনের এক কঠিন লড়াই। সন্তান জন্মদানের পর প্রায় সব নারীকেই একটি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়, কেন গর্ভাবস্থার বাড়তি ওজন কিছুতেই কমতে চায় না?
সমাজে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারকাদের দ্রুত আগের ওজনে ফিরে আসার ছবি দেখে অনেক সাধারণ নারীই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং নিজেদের শরীর নিয়ে একধরনের হীনম্মন্যতায় ভোগেন। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞান ও পুষ্টিবিদদের মতে, প্রসবের পর ওজন কমার প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক, ধীরগতির এবং এটি একেক নারীর ক্ষেত্রে একেক রকম হয়ে থাকে।
গর্ভাবস্থায় একটি শিশুর জন্ম দিতে গিয়ে মায়ের শরীর যে শারীরবৃত্তীয় ও হরমোনগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়, তা রাতারাতি আগের অবস্থায় ফিরে আসে না। তা ছাড়া নবজাতকের লালন-পালন, নির্ঘুম রাত এবং মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যাওয়া একজন নতুন মায়ের জন্য নিজের শরীরের যত্ন নেওয়া এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। তাই প্রসব-পরবর্তী এই পরিবর্তনগুলোকে দোষ না দিয়ে, বরং শরীরকে সময় দেওয়া এবং মা ও শিশুর সুস্থতাকেই প্রধান অগ্রাধিকার দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
শরীরে বড় পরিবর্তন আসে
গর্ভাবস্থায় কেবল শরীরে অতিরিক্ত চর্বিই জমে না, বরং শিশুর ওজন, প্ল্যাসেন্টা বা গর্ভফুল, অ্যামনিওটিক ফ্লুইড বা গর্ভের পানি, রক্তের পরিমাণ এবং জরায়ু ও স্তনের আকৃতি বৃদ্ধির কারণেও সামগ্রিক ওজন বৃদ্ধি পায়। সন্তান জন্মের পর এর কিছু অংশ দ্রুত কমে গেলেও শরীরের ভেতরের অনেক জৈবিক পরিবর্তন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে দীর্ঘ কয়েক মাস বা ক্ষেত্রবিশেষে তারও বেশি সময় লাগতে পারে।
একটি গবেষণায় ৩০৫ জন নারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সন্তান প্রসবের তিন মাস পরও ৮১ শতাংশ নারীর ওজন গর্ভধারণের আগের তুলনায় বেশি ছিল। তবে তিন থেকে ১২ মাসের মধ্যে তাদের ৭৪.৪ শতাংশের ওজন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অর্থাৎ, সন্তান জন্মদানের পর ওজন হ্রাসের গতি সবার ক্ষেত্রে এক রকম হয় না।
পেটের আকৃতি বদলানোর কারণ
গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের স্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে মায়ের পেটের পেশিতে অতিরিক্ত টান পড়ে। অনেক নারীর ক্ষেত্রেই পেটের পেশির মাঝখানের জোড় সরে গিয়ে দূরত্ব তৈরি হয়, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ডায়াস্টাসিস রেক্টি’ নামে পরিচিত। এর ফলে অতিরিক্ত ওজন ঝরে গেলেও পেট আগের তুলনায় কিছুটা নরম বা বড় দেখাতে পারে। এটি সবসময় কোনো অসুস্থতা বা ব্যায়ামের অভাবের লক্ষণ নয়, বরং এটি শরীরের স্বাভাবিক রূপান্তরের একটি অংশ।
হরমোন ও ঘুমের প্রভাব
সন্তান প্রসবের পর নারীর শরীরে হরমোনের স্তরে দ্রুত ও নাটকীয় পরিবর্তন আসে। এ ছাড়া শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর কারণে শরীরে বাড়তি শক্তির প্রয়োজন হয়, যা অনেক সময় ক্ষুধা বাড়িয়ে দেয়। তবে এর প্রভাব সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে কাজ করে না। অন্যদিকে, নবজাতক শিশুর পরিচর্যার কারণে মায়েদের রাতের ঘুম প্রায়ই ব্যাহত হয়। পর্যাপ্ত ঘুমের ঘাটতি ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন, শরীরের শক্তি এবং নিয়মিত শরীরচর্চার ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সুস্থতাই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার
বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্তান জন্ম দেওয়ার পরপরই আগের শারীরিক গঠনে বা ফিটনেসে ফিরে যাওয়ার অবাস্তব প্রত্যাশা করা উচিত নয়। ওজন কমানো একটি ধীর ও সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়া। চিকিৎসকের পরামর্শ ও গাইডলাইন মেনে ধীরে ধীরে শরীরচর্চা এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে ফিরলে শরীর সুস্থভাবে পুনরুদ্ধার হতে পারে।
তারকা হোন কিংবা সাধারণ নারী, মাতৃত্বের পর শরীরের এই রূপান্তর সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। তাই সমাজের তথাকথিত ‘আগের মতো হয়ে ওঠার’ মানসিক চাপের চেয়ে মা ও নবজাতকের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।