
মমতা কামাল হোসেন, বাঘা থেকে –
মুখভরা এক চিলতে হাসি। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর, তবু চোখেমুখে অদম্য প্রাণশক্তি। এই হাসিমাখা মুখটি রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আড়ানী মনমোহিনী উচ্চ বিদ্যালয়ের কয়েকটি প্রজন্মের কাছে এক অমূল্য স্মৃতি। তিনি প্রভাত কুমার নন্দী—সবার প্রিয় ‘গোল্টু স্যার’।
শ্রেণিকক্ষের ব্ল্যাকবোর্ড, হাতে চক আর শিক্ষার্থীদের ঘিরে কাটানো দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন আজ শুধুই স্মৃতি। কিন্তু সময়ের স্রোতও মুছে দিতে পারেনি তাঁর অবদান। তিনি ছিলেন এমন একজন শিক্ষক, যিনি ইংরেজি ভাষার পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শিখিয়েছেন সততা, শৃঙ্খলা, অধ্যবসায় ও মানবিকতার পাঠ।
আড়ানী মনমোহিনী উচ্চ বিদ্যালয়ে তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে হাজারো শিক্ষার্থী তাঁর সান্নিধ্যে বেড়ে উঠেছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকে আজ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছেন। কেউ বিসিএস ক্যাডার, কেউ চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, ব্যাংকার, আইনজীবী, সাংবাদিক কিংবা সফল উদ্যোক্তা। তাঁদের অনেকেই স্বীকার করেন, জীবনের ভিত্তি নির্মাণে গোল্টু স্যারের অবদান কখনো ভোলার নয়।
গোল্টু স্যারের ক্লাস ছিল শৃঙ্খলাবদ্ধ, কিন্তু কখনো ভীতিকর নয়। কঠিন ইংরেজি ব্যাকরণও তিনি সহজ উদাহরণ দিয়ে এমনভাবে বোঝাতেন যে দুর্বল শিক্ষার্থীরাও আত্মবিশ্বাস ফিরে পেত। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন ভালো শিক্ষার্থী হওয়ার আগে একজন ভালো মানুষ হওয়া জরুরি। তাই পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি তিনি নৈতিকতা, সময়ানুবর্তিতা, দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেমের শিক্ষা দিতেন।
প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের স্মৃতিচারণে বারবার উঠে আসে তাঁর কঠোর শাসনের কথা। তবে সেই শাসনের আড়ালে ছিল অকৃত্রিম স্নেহ। কোনো শিক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকলে খোঁজ নিতেন, পরীক্ষায় খারাপ করলে আলাদা করে ডেকে বুঝিয়ে দিতেন, আর ভালো ফল করলে নিজের সন্তানের মতো আনন্দ প্রকাশ করতেন।
বিদ্যালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর নিলেও গোল্টু স্যার মানুষের হৃদয় থেকে অবসর নেননি। আজও আড়ানী বাজারে কিংবা এলাকার কোথাও তাঁর সঙ্গে দেখা হলে প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা ছুটে এসে সালাম দেন, কুশল বিনিময় করেন। তাঁর মুখের সেই চিরচেনা হাসি যেন বলে দেয়—একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পুরস্কার তাঁর শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা।
বর্তমান সময়ে যখন শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রেই কেবল পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে, তখন প্রভাত কুমার নন্দীর মতো শিক্ষকের জীবন ও কর্ম আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একজন প্রকৃত শিক্ষক শুধু পেশাজীবী নন, তিনি একজন জাতি গড়ার কারিগর। তাঁর হাতে গড়ে ওঠা মানুষগুলোই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।
প্রভাত কুমার নন্দী- সবার প্রিয় গোল্টু স্যার। একজন শিক্ষক, একজন অভিভাবক, একজন অনুকরণীয় মানুষ। তাঁর প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও আন্তরিক শুভকামনা।ণ