
আব্দুল হক, বাঘা (রাজশাহী) প্রতিনিধি
একটি অটোভ্যান হারিয়ে থমকে গিয়েছিল অসহায় তরিকুল ইসলামের পরিবারের জীবিকা। বাঘা শাহী মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে চুরি হয়ে যায় তাঁর একমাত্র উপার্জনের অবলম্বন। শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ তরিকুল এরপর পরিবার নিয়ে পড়েন চরম অনিশ্চয়তায়। তবে সেই দুঃসময় বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মানবিক মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতায় তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে নতুন একটি অটোভ্যান।
গত ৪ জুলাই রাজশাহীর বাঘা উপজেলার ঐতিহাসিক বাঘা শাহী মসজিদে যোহরের নামাজ আদায় করতে যান উপজেলার আলাইপুর গ্রামের বাসিন্দা তরিকুল ইসলাম। নামাজ শেষে মসজিদের বাইরে এসে দেখেন, তালাবদ্ধ করে রাখা তাঁর অটোভ্যানটি নেই। আশপাশে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ভ্যানটির কোনো সন্ধান মেলেনি।
তরিকুলের বাবা আবুল হাশেম ও মা মোছা. মাজেদা বেগম। পরিবারের একমাত্র আয়ের অবলম্বন ছিল তাঁর অটোভ্যান। শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার কারণে সবসময় কাজ করতে না পারলেও যখন সুস্থ থাকতেন, তখন অটোভ্যান চালিয়ে যা আয় করতেন, তা দিয়েই কোনোভাবে পরিবারের খরচ চালাতেন। ভ্যানটি হারিয়ে যাওয়ার পর তাঁর পরিবারের সামনে নেমে আসে চরম অনিশ্চয়তা।
অসহায় তরিকুলের এই দুর্দশার খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেন স্থানীয় সচেতন ও মানবিক মানুষরা। তরিকুলের হারিয়ে যাওয়া কর্মসংস্থান ফিরিয়ে দিতে নতুন একটি অটোভ্যান কিনে দেওয়ার জন্য সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়।
আহ্বানে সাড়া দিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, প্রবাসী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থসহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসেন। অল্প সময়ের মধ্যেই মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। পরে সেই অর্থ দিয়ে নতুন অটোভ্যান কিনে অসহায় তরিকুল ইসলামের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত স্বেচ্ছাসেবীরা বলেন, একজন মানুষের জীবিকা হারিয়ে যাওয়ার খবর তাঁদের নাড়া দেয়। তাই তরিকুলকে শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, বরং এমন একটি ব্যবস্থা করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে তিনি নিজের শ্রমে আবারও আয় করতে পারেন। নতুন অটোভ্যানটি তাঁর পরিবারের জীবিকা নির্বাহের পথ পুনরায় তৈরি করবে—এটাই তাঁদের প্রত্যাশা।
মানবিক এই উদ্যোগের সার্বিক তত্ত্বাবধান করেন কাদিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. মাহফুজুর রহমান (স্বপন) এবং ‘আমাদের বাঘা’ ফেসবুক কমিউনিটি গ্রুপের সিনিয়র অ্যাডমিন এস আর সাকিব রহমান। কার্যক্রমটি পরিচালনা করে ‘আমাদের বাঘা’ ফেসবুক কমিউনিটি গ্রুপ, মানব সেবা ফাউন্ডেশন ও আলাইপুর যুব সমাজ।
উদ্যোক্তা সোহানুর রহমান সনি বলেন, “একজন অসহায় মানুষের হারিয়ে যাওয়া জীবিকার পথ পুনরায় তৈরি করে দেওয়াই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতায় তা সম্ভব হয়েছে।”
স্থানীয়রা বলছেন, তরিকুলের হাতে নতুন অটোভ্যান তুলে দেওয়ার ঘটনা কেবল একটি ভ্যান উপহার দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি প্রমাণ করে, বিপদে একজন মানুষের পাশে দাঁড়াতে সমাজের মানুষ একত্রিত হলে অসম্ভবও সম্ভব হয়ে ওঠে। মানুষের সম্মিলিত সহমর্মিতা ও সহযোগিতায় একজন অসহায় মানুষের পরিবার ফিরে পেয়েছে বেঁচে থাকার নতুন আশার আলো।
নতুন অটোভ্যান হাতে পেয়ে আবেগাপ্লুত তরিকুল ইসলাম তাঁর পাশে দাঁড়ানো স্থানীয় ও প্রবাসীসহ সকলের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাঁর ভাষায়, হারিয়ে যাওয়া জীবিকা ফিরে পাওয়ার এই সহযোগিতা তাঁর পরিবারের জন্য নতুন করে বেঁচে থাকার আশার আলো।