
দৃশ্যপট ডেস্ক
“শিক্ষকতা কিংবা অন্য কোনো পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের একই সঙ্গে সাংবাদিকতা করার সুযোগ নেই”-সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের দেওয়া এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক মহলে নানা আলোচনা আর কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আলোচনায় কেউ মাননীয় চেয়ারম্যান মহোদয়ের বক্তব্যকে সমর্থন জানাচ্ছেন আবার কেউ বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর এই মন্তব্য বাস্তবায়নযোগ্য নয়-এমনটাই ঘুরে ফিরে বলছেন।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষা, মানোন্নয়ন ও সংরক্ষণে প্রতিষ্ঠিত আধা বিচার বিভাগীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল। সংস্থাটির মাননীয় চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আব্দুল হাকিম সাংবাদিকতা নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন।
শিক্ষকদের প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, শিক্ষকরা সরকারের কাছ থেকে বেতন পান। ফলে শিক্ষকতার পাশাপাশি অন্য পেশায় যুক্ত হওয়া বা সাংবাদিকতা করার সুযোগ নেই। সাংবাদিকতা কেবল পদবি কিংবা পরিচয়পত্রের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না; এর সঙ্গে দায়িত্বশীলতা ও পেশাগত শৃঙ্খলার বিষয়ও জড়িত।
চেয়ারম্যান মহোদয় বলেছেন, “বিভিন্ন পেশায় কর্মরত ব্যক্তিদের সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।” এ ধরনের দ্বৈত পেশা সাংবাদিকতার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
চেয়ারম্যান স্যার তাঁর বক্তব্যে শুধু শিক্ষক-সাংবাদিক নয়, সাংবাদিকদের যে কোন দ্বৈত পেশা সমর্থনযোগ্য নয়-কথাটা জোর দিয়েই বলেছেন।
একজন ক্ষুদ্র সংবাদকর্মী হিসেবে প্রেস কাউন্সিলের মাননীয় চেয়ারম্যান স্যারের একটি কথাকেই আমি অবশ্যই সমর্থন করি। তিনি যথার্থই বলেছেন। শুধু সাংবাদিকতা নয়, কোটি কোটি বেকারের দেশে যেন কোন দ্বৈত পেশাই সমর্থনযোগ্য নয়।
আমরা পেশা বলতে কি বুঝি? জীবিকা অর্জনের জন্য যে কাজ বা দায়িত্ব পালন করি তাকেই পেশা বলা হয়। মূল কথা পেশা হলো এমন সব কর্ম যা থেকে কোন ব্যক্তি তার জীবিকা নির্বাহ করতে পারে। একজন ব্যক্তির একটি পেশাই থাকতে হবে-যে পেশার অর্জিত আয়ে নিজের পরিবারের ভরনপোষণ করতে পারবে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো মফস্বলে সাংবাদিকতা আদৌ কোন জীবিকা অর্জনের পেশা? যারা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সাংবাদিকতা করেন, তাদের আয় কি পরিবারের ভরণপোষন সম্ভব? মফস্বল সাংবাদিকদের মিডিয়া হাউসগুলো কি একটি পরিবারের পরিচালনার মতো যথেষ্ট পরিমাণ বেতন দেয়? সরকারি-বেসরকারি অন্যান্য চাকরিতে যেসব সুবিধাদি রয়েছে মফস্বল সাংবাদিকরা কি সেইসব সুবিধা আদৌ পায়? প্রশ্নগুলোর জবাব যদি হ্যা সূচক হয় তবে কোন কথা নেই। কিন্তু যদি না সূচক হয় তবে আরও একটি জুড়ে যায় প্রশ্ন “তাহলে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সাংবাদিকতা করা কি আদৌ কোন পেশার মধ্যে পড়ে?
যদি পেশার মধ্যে না পড়ে তবে, শিক্ষকতার পাশাপাশি সাংবাদিকতা কিংবা অন্য যে কোন পেশার সঙ্গে সাংবাদিকতা করায় দোষের কিছু আছে কি?
দেশে শত শত প্রিন্ট পত্রিকা, টেলিভিশন, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, আইপিটিভিসহ হাজারও গণমাধ্যম রয়েছে। এসব গণমাধ্যমের প্রধান কার্যালয়ে অথবা বিভিন্ন বিট কাভারের দায়িত্বে থাকা সাংবাদিকরা ওয়েজ বোর্ড অনুযায়ী বেতন পান; যা দিয়ে পরিবারের ভরনপোষণ করে এইক্ষেত্রে সাংবাদিকতা তাঁদের পেশা-এতে কোন সন্দেহ নেই।
কিন্তু যারা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সাংবাদিকতা করছেন, তাদের সিংহভাগই কোন বেতন পান না। প্রথম শ্রেণীর হাতেগোনা কিছু গণমাধ্যম যে বেতন দেয় তা দিয়ে পরিবারের ভরনপোষণ করা একেবারেই অসম্ভব। আবার প্রথম শ্রেণীর অনেক মিডিয়া আছে যেগুলো তাদের জেলা প্রতিনিধিদের বেতন নয়, মাসিক সম্মানী দেয়-যেটা দিয়ে কোনমতে ইন্টারনেট-মোবাইল খরচ ওঠে। আর কিছু টেলিভিশন, পত্রিকা রয়েছে, যারা বেতন বা সম্মানী কোনটা তো দেয়ই না, উল্টো প্রতিনিধিদের কাছ থেকে উপঢৌকন নেয়। প্রতিনিধিত্বের আইডেন্টি টিকিয়ে রাখার জন্য উপঢৌকন দিতে বাধ্য হন তারা।
এক্ষেত্রে মফস্বল সাংবাদিকতা আদৌ কোন পেশার মধ্যে পড়ে না। বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রে মফস্বল সাংবাদিকদের যে আর্থিক নিরাপত্তা রয়েছে, বাংলাদেশে তার এক শতাংশও নেই। তবুও সাংবাদিকদের সংখ্যা চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে-তবে ভদ্র, উচ্চ শিক্ষিত সমাজের সন্তানরা এই পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। বিপরীতে অপরাধচক্রের লোকজন সাংবাদিকতায় জড়িয়ে পড়েছে-যাদের কোন বেতন-ভাতার প্রয়োজন নেই, একটি কার্ড পেলেই চলবে। আর কার্ড পেয়ে তারা কি করছেন, এটা কারও অজানা নেই। এসব কারণে মফস্বল সাংবাদিকতার মান কতটা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে, সেটা শুধু সুধী সমাজ নয়, অক্ষর জ্ঞানহীন সাধারণ মানুষও বলতে পারবে। একসময় সাংবাদিকদের যতটা শ্রদ্ধার চোখে দেখতো সাধারণ মানুষ, এখন ততটাই ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখে।
কথাগুলো অপ্রিয় হলেও সত্য, অনেকেরই ভালো লাগবে না, ভালো লাগার কথাও নয়। কিন্তু আমি আমার অভিজ্ঞতায় যেটা দেখেছি বা দেখছি সেটাই উল্লেখ করলাম।
পরিশেষে সাংবাদিকদের দ্বৈত পেশা নিয়ে প্রেস কাউন্সিলের মাননীয় চেয়ারম্যান মহোদয়ের মন্তব্যকে সমর্থন জানিয়ে বলতে চাই মফস্বল সাংবাদিকতাকে পূর্ণ পেশার মর্যাদা দিয়ে তাদের জীবন-জীবিকা পরিচালনার আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক। তাহলে সাংবাদিককে বাধ্য হয়েই দ্বৈত পেশা পরিত্যাগ করতে হবে। আর যদি সেটা না করা হয়, তবে জীবিকার জন্য অন্য যে কোন পেশার পাশাপাশি সাংবাদিকতা করতে হবে।
লেখক: স্বপন চন্দ্র দাস। সম্পাদক ” দৈনিক প্রতিদিনের দৃশ্যপট”।