
অনলাইন ডেস্ক
দৈনন্দিন জীবনে প্রস্রাবের রঙে হঠাৎ অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখলে অনেকেই চিন্তিত হয়ে পড়েন। বিশেষ করে প্রস্রাবের রং যদি হঠাৎ উজ্জ্বল হলুদ বা হলুদাভ সবুজ-এর মতো হয়, তবে বিষয়টি আতঙ্ক তৈরি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এ প্রকাশিত একটি বিশেষ স্বাস্থ্য প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতামতের ভিত্তিতে এই প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, খাদ্যাভ্যাস বা নির্দিষ্ট কিছু ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের কারণে প্রস্রাবের রং এরকম উজ্জ্বল হলুদ হতে পারে, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সুস্থ মানুষের জন্য কোনো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ নয়। ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের নেফ্রোলজিস্ট ড. সুজান ওয়াটনিক এবং ইনডিয়ানা ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের নেফ্রোলজিস্ট ড. শ্যারন মো-এর মতো বিশ্বখ্যাত বিশেষজ্ঞদের মতামত বিশ্লেষণ করে প্রস্তুতকৃত এই স্বাস্থ্যফিচারে জেনে নিন উজ্জ্বল হলুদ প্রস্রাবের আসল কারণ ও শারীরিক সংকেত।
প্রস্রাবের স্বাভাবিক রং তৈরি হয় কীভাবে?
আমাদের পাকস্থলী ও অন্ত্রে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে ‘ইউরোবিলিন’ নামক এক ধরনের পিগমেন্ট বা রঞ্জক পদার্থ তৈরি হয়, যা প্রস্রাবকে তার স্বাভাবিক হলুদ বর্ণ দান করে। শরীরে তরলের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে এই রঙের তীব্রতা পরিবর্তিত হয়। যেমন—পর্যাপ্ত পানি পান করলে প্রস্রাব হালকা দেখায়, আর পানিশূন্যতা থাকলে বা সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর তা কিছুটা গাঢ় হতে পারে।
অনেক সময় প্রস্রাবের রং মাপার নানা ধরনের চার্ট দেখা যায়, তবে ড. সুজান ওয়াটনিকের মতে, এসব চার্ট নির্দিষ্ট নয় এবং কিডনি রোগের মতো গুরুতর বিষয় মূল্যায়নে চিকিৎসকরা এগুলোর ওপর নির্ভর করেন না। সাধারণ সুস্থ ব্যক্তির ক্ষেত্রে কেবল চার্ট না দেখে তৃষ্ণাবোধের ওপর ভিত্তি করে পানি পান করাই সবচেয়ে ভালো উপায়। তবে যাদের কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, তাদের প্রস্রাব সব সময় হালকা রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
উজ্জ্বল বা ফ্লুরোসেন্ট হলুদ রঙের আসল কারণ
আমাদের কিডনি নিয়মিত রক্ত ফিল্টার করে শরীরে পানি, খনিজ, লবণ ও এসিডের নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রাখে। কিডনি সুস্থ থাকলে অতিরিক্ত বা অপ্রয়োজনীয় উপাদান শরীর জমিয়ে রাখে না।
ভিটামিন বি ও রাইবোফ্লেভিন: খাবার বা অতিরিক্ত ভিটামিন সাপ্লিমেন্টের মাধ্যমে গ্রহণ করা পানিতে দ্রবণীয় উপাদানগুলো কিডনি প্রস্রাবের সাথে বের করে দেয়। বিশেষ করে ভিটামিন বি (যেমন: রাইবোফ্লেভিন বা Riboflavin) বেশি গ্রহণ করলে প্রস্রাব একদম ফ্লুরোসেন্ট বা উজ্জ্বল হলুদ রঙের রূপ নেয়।
অন্যান্য খাবারের প্রভাব: বিট খেলে প্রস্রাব গোলাপি কিংবা রেওয়াঁচ খেলে তা লালচে-বাদামি হতে পারে।
ড. শ্যারন মো স্পষ্ট করেন যে, প্রস্রাব যখন অতিরিক্ত ফ্লুরোসেন্ট বা উজ্জ্বল দেখায়, তার অর্থ হলো শরীর এমন কিছু পুষ্টি উপাদান বা ভিটামিন গ্রহণ করেছে যা তার কাজে লাগছে না এবং তা বের করে দেওয়া হচ্ছে।
প্রস্রাবের রং বদলালে কী করবেন?
সুস্থ মানুষদের ক্ষেত্রে প্রস্রাবের রঙের এমন পরিবর্তন জরুরি কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি নির্দেশ করে না। এই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বিশেষজ্ঞরা নিচের ধাপগুলো অনুসরণের পরামর্শ দেন:
১. সাপ্লিমেন্ট সাময়িক বন্ধ করা: প্রথমে ব্যবহৃত অতিরিক্ত ভিটামিন বা ডায়েটারি সাপ্লিমেন্ট নেওয়া বন্ধ রেখে পরিবর্তন লক্ষ্য করুন।
২. রঙিন খাবার এড়িয়ে চলা: সাপ্লিমেন্ট বন্ধের পরও রং স্বাভাবিক না হলে উজ্জ্বল রঙিন খাবার খাওয়া বন্ধ করুন।
৩. প্রেসক্রিপশনের ওষুধ যাচাই: নতুন কোনো ওষুধ শুরু করে থাকলে চিকিৎসকের সাথে কথা বলুন। অনেক ওষুধের ক্ষেত্রে প্রস্রাবের রং পরিবর্তন হওয়া একটি স্বাভাবিক ও ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে (তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া প্রেসক্রিপশনের ওষুধ বন্ধ করা যাবে না)।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি?
প্রস্রাবের কিছু কিছু পরিবর্তন গুরুতর শারীরিক জটিলতার পূর্বাভাস হতে পারে:
লাল বা বাদামি প্রস্রাব: খাদ্য বা ওষুধের প্রভাব ছাড়া প্রস্রাব লাল বা বাদামি হলে তা কিডনি, মূত্রথলি বা মূত্রনালীর রক্তপাতের সংকেত হতে পারে।
অতিরিক্ত ফেনা যুক্ত প্রস্রাব: প্রস্রাবে বিয়ারের ফেনার মতো অতিরিক্ত ফেনা দেখা দিলে কিডনি থেকে প্রোটিন লিক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
দুর্গন্ধ ও ঘোলাটে ভাব: প্রস্রাবে মিষ্টি বা দুর্গন্ধ, অতিরিক্ত ঘোলাটে ভাব, কিংবা প্রস্রাবের পরিমাণে হঠাৎ বড় পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
উল্লেখ্য, ড. শ্যারন মো সতর্ক করে জানান, অধিকাংশ কিডনি রোগের শুরুতে কোনো স্পষ্ট লক্ষণ থাকে না। তাই উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা, মাংস পরিমিত খেয়ে প্রচুর ফলমূল ও শাকসবজি গ্রহণ করা কিডনি সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
সূত্রঃ দৈনিক কালবেলা।