
ন্যাশনাল ডেস্ক
জাপানি বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি নিয়ে টানা চার দিনের সফর শেষে টোকিও থেকে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাকে বহনকারী বিমানটি গতকাল রাত ৩টার দিকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। জাপানে প্রধানমন্ত্রীর এই সফর বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় উন্নীত করেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, সফরে ৬.৩ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পাশাপাশি দেশের বেকার যুবসমাজের জন্য প্রায় ২ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির বার্তা মিলেছে, যা দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের গতিশীলতা আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে যেসব সমঝোতা ও দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে, তা দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে সফরের এই সাফল্যকে টেকসই রূপ দিতে এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে অর্জিত প্রতিশ্রুতির দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়নের বিষয়টি।
টয়োটার কারখানা পরিদর্শন ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠক: সফরের শেষ দিন গতকাল সকালে প্রধানমন্ত্রী জাপানের নাগোয়া সিটিতে বিশ্বখ্যাত অটোমোবাইল প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান টয়োটার প্রধান কারখানা ও সংযোজন প্ল্যান্ট পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি কারখানার গাড়ি সংযোজন (অ্যাসেম্বলি) প্রক্রিয়া ঘুরে দেখেন। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন জানান, পরিদর্শনকালে টয়োটা মোটর করপোরেশনের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসাহিকো মোয়েদা, টয়োটা সুশো করপোরেশনের মোবিলিটি বিভাগের সিইও শিগেরু হারাদা এবং প্রতিষ্ঠানটির চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) শিনিচিরো ওতসুকাসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী কারখানায় পৌঁছানোর পর টয়োটার কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীকে টয়োটার প্রথম প্রাইভেটকারে ওঠার আমন্ত্রণ জানান। এ সময় সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানকে নিয়ে গাড়িটিতে ওঠেন প্রধানমন্ত্রী। ১৯৩৫ সালে তৈরি হয় টয়োটা পরিবারের প্রথম গাড়ির প্রোটোটাইপ টয়োটা মডেল এ১। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৩৬ সালে তৈরি হয় টয়োটা মডেল এএ, যা টয়োটার প্রথম উৎপাদিত যাত্রীবাহী গাড়ি। বর্তমানে জাপানের টয়োটা সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত রয়েছে গাড়িটির প্রতিরূপ।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. মো. শাকিরুল ইসলাম খান, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, গবেষণা কর্মকর্তা আবদুস সাত্তার পাটোয়ারী প্রমুখ।
কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক শীর্ষ সফর: চার দিনের নিবিড় সফরসূচিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিসহ দেশটির সরকারের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা, নীতিনির্ধারক, শীর্ষ ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহের সুযোগ-সুবিধা এবং যৌথ উদ্যোগের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়। সফরকালে দুদেশের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা আরও মজবুত করতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়।
প্রবাসী ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের প্রতিক্রিয়া: জাপান প্রবাসী বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা সর্বসম্মতিক্রমে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্ববহ, সময়োপযোগী ও বৈপ্লবিক বলে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে সরাসরি ৬.৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের চুক্তি ও আশ্বাস অর্জন এবং ২ লাখ কর্মসংস্থানের দিগন্ত উন্মোচিত হওয়া বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হয়ে থাকবে।
জাপানে চল্লিশ বছর ধরে বসবাস করছেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, বিজিএমইএর উপদেষ্টা কাজী সারওয়ার হাবিব। যিনি ১৪ বার এনআরবি-সিআইপি সম্মাননা পেয়েছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সফর প্রসঙ্গে বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বর্তমানে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরকে কেন্দ্র করে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক ও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে অভূতপূর্ব সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে জাপান বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক আমদানিকারক দেশ, যারা প্রতি বছর প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করে। তবে বাংলাদেশ বিশ্বমানের পোশাক তৈরি করলেও জাপানের বাজারে আমরা এখন পর্যন্ত মাত্র ১.৪ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করতে পেরেছি। এ বছর বিজিএমইএতে ‘জাপান ডেস্ক’ ওপেন হয়েছে এবং ৫২ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো জাপানি রাষ্ট্রদূত বিজিএমইএ ভিজিট করেছেন। তারা আমাদের কাছ থেকে আগামীতে ৩ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারের পোশাক কেনার আশ্বাস দিয়েছেন।
কাজী সারওয়ার হাবিব মনে করেন বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির (ইপিএ) আওতায় প্রায় ৭,৩৯৮টি পণ্য বা রপ্তানি পণ্যের ৯৮ শতাংশই ট্যাক্স ফ্রি সুবিধা পাচ্ছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বহুগুণ বেড়ে যাবে।
বিএনপি চেয়ারম্যানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সদস্য বদরুল আলম চৌধুরী শিপলু মনে করেন উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রে জাপান সবসময়ই বাংলাদেশের অন্যতম বিশ্বস্ত বন্ধু। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের টোকিও সফরের মাধ্যমে যে সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচিত হলো, তার প্রকৃত সুফল পেতে হলে চুক্তি ও আশ্বাসগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে প্রকল্পগুলো সঠিক সময়ে শেষ করার ওপরই এখন মূল সাফল্য নির্ভর করছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আখ্যা দেন জাপান প্রবাসী ও সফল ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার হোসেইন মো. সারোয়ার সানি, যিনি জাপান রেমিট ফাইন্যান্স (জেআরএফ) গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অত্যন্ত চমৎকার হলেও জাপানি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের সঠিক চিত্র তুলে ধরার ক্ষেত্রে এখনো কিছু ঘাটতি রয়েছে। তার মতে, জাপানি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত মালয়েশিয়া বা ভিয়েতনামে বেশি বিনিয়োগ করেন। কারণ সেখানে তাদের প্রচার বা পিআর (পাবলিক রিলেশন) অনেক শক্তিশালী। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ বা গ্যাসের কিছু সংকট থাকলেও যে কোনো সমস্যা সমাধান করা মানুষের কাজ। সুতরাং, জাপানিদের কাছে বাংলাদেশকে সঠিকভাবে ব্র্যান্ডিং করতে হবে। জাপানে বসবাসরত বাংলাদেশিরাই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সেতু হিসেবে কাজ করতে পারেন, কারণ প্রবাসীদের প্রতি তাদের আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
জাপান বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান জনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি তৈরি ও অর্থনৈতিক গতি বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আমি বিশ্বাস করি। টোকিও সফরে যেসব কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে আমাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিশ্রুতি বজায় রাখতে হবে।
উড়োজাহাজে যান্ত্রিক ত্রুটিতে বিলম্বিত যাত্রা: চার দিনের সফর শেষে জাপানের স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায় বাংলাদেশ বিমানের একটি বিশেষ ফ্লাইটে প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করার কথা ছিল। সেই সূচি অনুযায়ী জাপানি প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিমানবন্দরে তাদের বিদায়ও জানিয়েছিলে। তবে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে যথাসময়ে প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের নিয়ে উড্ডয়ন করতে পারেনি উড়োজাহাজটি। পরে ত্রুটি সারিয়ে ৫ ঘণ্টা পর স্থানীয় সময় রাত ১১টার দিকে উড়োজাহাজটি নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয়।
সূত্রঃ দৈনিক কালবেলা।