
ক্রীড়া ডেস্ক
শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কত হলে একজন অ্যাথলেট নারী শ্রেণিতে প্রতিযোগিতার অধিকার হারান—এটি বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের দীর্ঘদিনের বিতর্ক; যার বাংলাদেশি সংস্করণের সিদ্ধান্ত এলো গতকাল। যেই সিদ্ধান্তে জান্নাত বেগম ও কবিতা রায়কে নারীদের প্রতিযোগিতা থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
দুজনের শরীরে যে হরমোনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, তা সাধারণ নারীদের তুলনায় অনেক বেশি। এ মাত্রা যাদের শরীরে থাকে, তাদের নারী নয়, চিকিৎসা শাস্ত্র পুরুষ হিসেবে নির্দেশ করে। এটি নিশ্চিত হওয়ার পর দুই ক্রীড়াবিদকে নারীদের সব কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তাদের অর্জিত সব পদকও বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জান্নাত বেগম বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অ্যাথলেট, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর হয়ে খেলতেন কবিতা রায়। তাদের লিঙ্গ নির্ধারণসংক্রান্ত ইস্যুতে বিতর্ক চলছে অনেকদিন ধরেই। এ-সংক্রান্ত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষার অনুরোধ জানানো হয়। সেই পরীক্ষার ফল পাওয়ার পরই গুরুত্বপূর্ণ এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।
সিদ্ধান্তটা নেওয়া হয়েছে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে। গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। বোর্ডের কাজ শেষ হয় ১১ মে। ১৬ মে বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন হস্তান্তর করা হয়। সেই প্রতিবেদনের আলোকেই দুই ক্রীড়াবিদকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের নির্বাহী কমিটির সভায় চিকিৎসা শাস্ত্র ও বিশ্ব অ্যাথলেটিকস সংস্থার বিধি অনুযায়ী দুজনকে নারী অ্যাথলেট হিসেবে প্রতিযোগিতা থেকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জান্নাত বেগমের জ্যাভলিন ও ডিসকাস ইভেন্টে জাতীয় রেকর্ডের মালিক। তার ঝুলিতে রয়েছে আট স্বর্ণ, এক রুপা ও দুই ব্রোঞ্জ পদক। কবিতা রায় ১০০ মিটার, ২০০ মিটার ও চার গুণিতক ১০০ মিটার ইভেন্টে এক স্বর্ণ, এক রুপা ও দুই ব্রোঞ্জ পদক জিতেছিলেন। তাদের অর্জিত সব পদকও বাতিল করেছে ফেডারেশন।
এ নিয়ম নিয়ে বিশ্বমঞ্চে লড়াই থেমে নেই। দক্ষিণ আফ্রিকার দৌড়বিদ ক্যাস্টার সেমেনিয়ার মামলা এ বিতর্কের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ২০১৯ সালে ক্রীড়া সালিশি আদালতে হেরে যাওয়ার পর তিনি ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতে আপিল করেন। ২০২৩ সালে আদালতের একটি চেম্বার তার পক্ষে রায় দিলেও সুইজারল্যান্ড সরকার তা গ্র্যান্ড চেম্বারে পুনর্বিবেচনার আবেদন করে। ২০২৫ সালের ১০ জুলাই গ্র্যান্ড চেম্বার চূড়ান্ত রায়ে জানান, সুইজারল্যান্ড ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদের ৬ নম্বর অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করেছে, কারণ সুইস ফেডারেল ট্রাইব্যুনাল সেমেনিয়ার আপত্তি যথাযথ কঠোরভাবে পর্যালোচনা করেনি। গোপনীয়তা ও বৈষম্যবিরোধী অনুচ্ছেদ সংক্রান্ত অভিযোগগুলো সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট না হওয়ায় আদালত তা বিবেচনায় নেননি—অর্থাৎ ডিএসডি নিয়মের মূল বৈধতা এখনো অক্ষুণ্নই রয়ে গেছে আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোয়।
এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের সিদ্ধান্ত কার্যত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেরই অনুসরণ। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় মানবিক জায়গায়—একজন অ্যাথলেট যিনি জন্মগতভাবেই এমন শারীরিক বৈশিষ্ট্য বহন করে বড় হয়েছেন, নিজের অজান্তেই যিনি বছরের পর বছর দৌড়েছেন কিংবা জ্যাভলিন ছুড়েছেন। তার জন্য এ রায় কতটা ন্যায্য শাস্তি, আর কতটা এক নিষ্ঠুর জীববৈজ্ঞানিক বাস্তবতার বলি হওয়া—তার উত্তর মেডিকেল রিপোর্টের সংখ্যায় নেই, আছে মানবিক বিবেচনার গভীরে।