
ন্যাশনাল ডেস্কঃ
জাপানের আইচি প্রশাসনিক অঞ্চলের নাগোয়া শহর এশিয়ান গেমসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের জন্য প্রস্তুত। তৃতীয়বারের মতো জাপানের মাটিতে বসতে যাচ্ছে মহাদেশীয় ক্রীড়াযজ্ঞ, ১৯৫৮ সালে টোকিও এবং ১৯৯৪ সালে হিরোশিমার পর। আগের আয়োজন তো বটেই, গেমসের ইতিহাসের বৈচিত্র্যপূর্ণ উদ্বোধন উপহার দিতে প্রস্তুত জাপান।
স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায় পুনর্নির্মিত পালোমা মিজুহো স্টেডিয়ামে পর্দা উঠতে যাচ্ছে কুড়িতম এশিয়ান গেমসের। এবারের স্লোগান ‘ইমাজিন ওয়ান এশিয়া’—এক বাক্যে যেন সমগ্র মহাদেশকে একটি হৃৎপিণ্ডের ছন্দে বাঁধার প্রতিশ্রুতি। আসরে ৪৫ দেশ থেকে ১১ হাজারের বেশি ক্রীড়াবিদ লড়বেন ৪৩ খেলায়। ৪৬৯ স্বর্ণের জন্য লড়াইয়ে নামছেন মহাদেশীয় ক্রীড়াবিদরা।
উদ্বোধনী রাতের সবচেয়ে বড় চমক কিন্তু কোনো তারকা অ্যাথলেট নয়, বরং একজন পরিচালক। ৭০ বছর বয়সী সুতসুমি ইউকিহিকো, যিনি নিজেই নাগোয়ার মানুষ। ‘টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি বয়েজ’-এর মতো জনপ্রিয় জাপানি সিরিজের এই কারিগর গেমসের মঞ্চে গল্প বলার দায়িত্ব নিয়েছেন। তার ভাষায়, ‘এই আয়োজনের উদ্বোধন হবে চিরাচরিত ছকের বাইরে। যেখানে ওয়ারি ও মিকাওয়া অঞ্চলের প্রাচীন কারুশিল্প মিলবে অত্যাধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির সঙ্গে।’ সংগঠকদের দেওয়া নাম ‘হার্ট বিট আইচি-নাগোয়া’, আর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য বেছে নেওয়া থিম, ‘হারমোনিক হার্ট বিট’ বলে দিচ্ছে এশিয়ার লাখো-কোটি ক্রীড়াপ্রেমীর হৃৎস্পন্দন এক তালে বাঁধার চেষ্টা হবে উদ্বোধনের মঞ্চে।
সন্ধ্যা ৬টায় মূল অনুষ্ঠানের আগে বিকেল ৪টা থেকে শুরু হবে ‘ওয়ার্মআপ স্টেজ’, যেখানে গান গাইবে জাপানের জনপ্রিয় বয় গ্রুপ আইএনআই। মঞ্চ মাতাবে গ্রামীণ জাপানের লাঠিখেলার ঐতিহ্য, যা আধুনিক পপ সংস্কৃতির পাশাপাশি দাঁড়িয়ে এক অন্যরকম মিশেল তৈরি করবে। আসল আবেগের জায়গা তৈরি হবে মশাল রিলে ঘিরে—অলিম্পিক কুস্তিতে তিনবার স্বর্ণজয়ী কিংবদন্তি ইয়োশিদা সাওরি প্রথম বাহক হিসেবে মঞ্চে উঠবেন, যা জাপানি ক্রীড়াপ্রেমীদের কাছে এক নস্টালজিক মুহূর্ত হয়ে উঠতে পারে। আকাশে থাকবে জাপানের বিমানবাহিনীর ব্লু ইমপালস দলের ফ্লাইপাস্ট প্রদর্শনী, যা স্টেডিয়ামের ছাদহীন উন্মুক্ত আকাশে অন্যরকম দৃশ্যকল্প তৈরি করবে।
২০২৩ সালে হাংঝু গেমসের উদ্বোধন যেখানে চীনের রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পর্যায় যুক্ত ছিল, হয়েছিল ঐতিহ্যের বিশাল প্রদর্শনীও। প্রেসিডেন্ট শি জিং পিং নিজে উদ্বোধন করেছিলেন গেমসের। নাগোয়া সেই পথে হাঁটছে না। বরং এখানকার আয়োজন তুলনামূলক ঘরোয়া। স্থানীয় সংস্কৃতিনির্ভর, আর প্রযুক্তির নিরীক্ষায় ভরপুর—যেন বড় রাজনৈতিক মঞ্চের বদলে একটি শহরের হৃদয় থেকে বলা গল্প। নতুন করে গড়া ৩০ হাজার আসনের স্টেডিয়ামটি এপ্রিলেই প্রস্তুত হয়েছিল এ উপলক্ষে। পাশাপাশি
জুডো-বাস্কেটবলের জন্য তৈরি হয়েছে একেবারে নতুন ভেন্যু ‘আইজি অ্যারেনা’, যা এই আসরের অবকাঠামোগত নতুনত্বের একটা বড় দৃষ্টান্ত।
বাংলাদেশের জন্য এই আসরের গুরুত্ব ভিন্ন মাত্রায়। ২৬০ সদস্যের বিশাল বহর নিয়ে ২২ ক্রীড়ায় লড়বে
লাল-সবুজরা। উদ্বোধনী মার্চপাস্টে জাতীয় পতাকা বহনের জন্য শুটার আব্দুল্লাহেল বাকী ও কারাতেকা হুমায়রা আক্তার অন্তরাকে বেছে নেওয়া হয়েছে। এবারের আসরে ক্রিকেট, কাবাডি, আরচারি ও শুটিংয়ে পদকের স্বপ্ন দেখছেন লাল-সবুজের কর্মকর্তারা। হাংঝুতে ক্রিকেটে দুটি ব্রোঞ্জ জেতা বাংলাদেশ এবার নতুন লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে। প্রথমবারের মতো এশিয়ান গেমসে জায়গা করে নেওয়া মেয়েদের হকি দলও থাকবে সেই মিছিলে, যা নিজেই একটি ছোট ইতিহাস।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সম্প্রচার নিয়ে এখনো কিছুটা ধোঁয়াশা আছে—জাপানের প্রধান বেসরকারি চ্যানেল টিবিএসের সরাসরি সম্প্রচার নিশ্চিত হয়নি। যদিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ইউ-নেক্সট সন্ধ্যা সাতটা থেকে সরাসরি সম্প্রচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। গেমস শুরুর প্রাক্কালে আবাসন নিয়ে আছে বিস্তর অভিযোগ। চোখ রাঙাচ্ছে প্রকৃতি—দুজুয়ান নামের ঝড়ের পূর্বাভাস জারি করা হয়েছে। ৯০ থেকে ১২৬ কিলোমিটার বেগে বাতাস বইতে পারে বলে সতর্কতা জারি করেছে স্থানীয় আবহাওয়া দপ্তর।
আয়োজনে সমন্বয়হীনতা, আবাসন ও পরিবহন নিয়ে অভিযোগ এবং প্রকৃতির চোখ রাঙানির মাঝেও এগিয়ে চলা এই আসর কতটুকু সফল হয়—সময়ই বলতে পারে।