
সোহেল খান দূর্জয়, নেত্রকোনা প্রতিনিধি:
নেত্রকোনার আটপাড়ায় দৈনিক কালের কণ্ঠের জেলা প্রতিনিধি ইবাদ হোসেনকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় একটি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক চুন্নু খানের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন ওই সাংবাদিক। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে চুন্নু খানের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কথোপকথনের অডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি। তিনি কাউকে হুমকি দেননি বলে দাবি করেছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আটপাড়া উপজেলা সদরের পোস্ট অফিস রোড এলাকায় সাংবাদিক ইবাদ হোসেনসহ ৮ থেকে ১০টি পরিবারের বাড়ি থেকে প্রধান সড়কে যাতায়াতের জন্য একটি রাস্তা দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রায় ১৪ থেকে ১৫ বছর ধরে ব্যবহৃত ওই রাস্তার চলাচল নিয়ে সম্প্রতি জমির মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধ দেখা দেয়।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, প্রায় সাত থেকে আট বছর আগে তাঁরা চলাচলের সুবিধার্থে সম্মিলিতভাবে এক শতক জমি কিনেছিলেন। পরে স্থানীয় বাসিন্দাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রায় দুই মাস আগে রাস্তাটিতে ইটের সলিং করে।
তবে সলিং নির্মাণের প্রায় এক মাস পর রাস্তার পাশের জমির মালিক শাহীন সুলতানা সুমি জমিটি নিজেদের বলে দাবি করেন। এরপর তাঁর চাচাতো ভাই চুন্নু খানসহ স্থানীয় কয়েকজনের বিরুদ্ধে রাস্তাটি বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ ওঠে।
রাস্তা ব্যবহারকারী পরিবারগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, বিরোধের জেরে রাস্তাটিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হলে তাঁরা আদালতের শরণাপন্ন হন। আদালত রাস্তাটির ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করেন বলে তাঁরা জানিয়েছেন। এরপরও রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হলে ৮ থেকে ১০টি পরিবারের সদস্যরা চলাচলে সমস্যায় পড়েন। পরে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের সহযোগিতায় রাস্তাটি খুলে দেওয়া হয়।
সাংবাদিক ইবাদ হোসেনের অভিযোগ, রাস্তা খুলে দেওয়ার পর থেকে চুন্নু খান তাঁকে বিভিন্নভাবে হুমকি ও অশালীন ভাষায় গালাগাল করছেন। একই সঙ্গে সামরিক বাহিনীতে কর্মরত তাঁর ছোট ভাইয়ের চাকরি নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া এবং আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরে (আইএসপিআর) অভিযোগ করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ইবাদ হোসেন বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে রাস্তাটি ব্যবহার করছি। চলাচলের জন্য জমিও কিনেছি। এরপরও রাস্তাটি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। রাস্তা খুলে দেওয়ার পর থেকে আমাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছি। নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা চেয়ে গত ২০ অক্টোবর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।”
অন্যদিকে চুন্নু খান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, অডিও রেকর্ডটি এআই দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। তিনি কাউকে প্রাণনাশের হুমকি দেননি। তাঁর দাবি, সাংবাদিক ইবাদ হোসেন তাঁর এক আত্মীয়ের জমি দখল করে রাস্তা নির্মাণ করেছেন। বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় বসার প্রস্তাব দেওয়া হলেও ইবাদ রাজি হননি। বরং এ নিয়ে মামলা করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
চুন্নু খান নিজেকে শিক্ষকতার পাশাপাশি উপজেলা বিএনপির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য বলে পরিচয় দেন।
তবে তাঁর রাজনৈতিক পদ-পদবি নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম হিলালী।
তিনি বলেন, “সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমে দেখেছি। পরে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছি এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার আশ্বাস দিয়েছি। একজন সাংবাদিককে হুমকি দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাঁকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।”
চুন্নু খানের রাজনৈতিক পরিচয় প্রসঙ্গে রফিকুল ইসলাম হিলালী দাবি করেন, চুন্নু খানের বিএনপিতে কোনো পদ নেই, এমনকি তিনি দলের সাধারণ সদস্যও নন।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর কবির আহাম্মদ বলেন, তিনি এখনো সংশ্লিষ্ট অডিও রেকর্ডটি শোনেননি। তবে অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
আটপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জুবায়দুল আলম বলেন, ৮ থেকে ১০টি পরিবারের চলাচলের রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সাংবাদিক ইবাদ হোসেন অভিযোগ করেন। পরে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের হস্তক্ষেপে রাস্তাটি খুলে দেওয়া হয়। হুমকির ঘটনায় সাংবাদিক থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
এদিকে রাস্তা ব্যবহারকারী ইবাদ হোসেনের প্রতিবেশী কামরুল হাসান রবিন, খায়রুল কবির ও সুমন ভূঁইয়া জানান, চলাচলের সুবিধার্থে তাঁরা সম্মিলিতভাবে রাস্তার জন্য জমি কিনেছিলেন। তাঁদের অভিযোগ, রাস্তাটি বন্ধ করে দেওয়ায় তাঁরা দুর্ভোগে পড়েন। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার দাবি করেন তাঁরা।
তবে অডিও রেকর্ডটির সত্যতা, জমির মালিকানা এবং রাস্তা বন্ধ করার ঘটনায় কার কী ভূমিকা ছিল, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।