
রায়গঞ্জ (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি
অভাবের সংসার, অনিশ্চিত আয় আর প্রতিদিনের টানাপোড়েন—এ যেন তাঁদের নিত্যদিনের সঙ্গী। বাবা ইমারত নির্মাণশ্রমিক, কাজ পেলে আয় হয়, না পেলে কাটে অনিশ্চয়তায়। মা একটি এনজিও অফিসে আয়ার কাজ করে মাসে পান মাত্র ৬ হাজার টাকা। এই সামান্য আয়েই চলে সংসার, মেটাতে হয় নানা প্রয়োজন। এরই মধ্যে সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগাতে নিজেদের কত প্রয়োজন যে তাঁরা বিসর্জন দিয়েছেন, তার হিসাব হয়তো কারও জানা নেই। কিন্তু এত কষ্টের মধ্যেও ছেলের স্বপ্নকে থামতে দেননি তাঁরা। সেই স্বপ্ন বুকে নিয়েই এগিয়ে চলেছেন সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার মো. মোন্নাফ হোসেন (মুন্না)। দারিদ্র্যকে জয় করে এসএসসির পর এবার এইচএসসি পরীক্ষাতেও জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন তিনি। তাঁর এই সাফল্যে আজ বাবা-মায়ের চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক, দীর্ঘদিনের কষ্টের মাঝে ফুটেছে তৃপ্তির হাসি।
মুন্নার সাফল্য কেবল একটি ভালো ফলের গল্প নয়; এটি একজন শ্রমজীবী বাবার ঘাম, একজন মায়ের নিরন্তর ত্যাগ আর একজন সন্তানের অদম্য ইচ্ছাশক্তির গল্প। যে সংসারে প্রতিটি টাকা হিসাব করে খরচ করতে হয়, সেখানে স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়াই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই নিজের মেধা ও অধ্যবসায়ের প্রমাণ দিয়েছেন মুন্না।

তিনি এবার সরকারি বেগম নুরুন্নাহার তর্কবাগীশ অনার্স কলেজের বাণিজ্য বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছেন। এর আগে ২০২৪ সালে ধানঘরা মডেল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষাতেও জিপিএ-৫ অর্জন করেন তিনি। ধারাবাহিক এই সাফল্যে পরিবারে যেমন আনন্দের আবহ তৈরি হয়েছে, তেমনি নতুন করে আশার আলো দেখছেন তাঁর বাবা-মা। তাঁদের প্রত্যাশা, ছেলের এই অর্জন একদিন পরিবারের দুঃখ-কষ্ট ঘোচানোর পথ তৈরি করবে।
মুন্নার মা মোছা. মিরা খাতুন একটি এনজিও অফিসে আয়ার কাজ করেন। মাস শেষে পাওয়া ৬ হাজার টাকা দিয়ে সংসার চালানো, অভাব সামলানো এবং ঋণের বোঝা নিয়ে পথ চলা—সবকিছুই তাঁর কাছে প্রতিদিনের কঠিন বাস্তবতা। তারপরও ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগাতে কখনো পিছপা হননি তিনি। নিজের প্রয়োজনকে ছোট করে দেখেছেন, কিন্তু ছেলের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নকে ছোট হতে দেননি।
মোছা. মিরা খাতুন বলেন, ‘ছেলেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করব—এটাই আমার স্বপ্ন। এনজিও অফিসে আয়ার কাজ করে মাসে মাত্র ৬ হাজার টাকা বেতন পেতাম। সংসারে অভাব-অনটন ও ঋণ রয়েছে। তারপরও নিজের প্রয়োজন কমিয়ে ছেলের পড়াশোনার পেছনে টাকা খরচ করেছি। ছেলের এই ফলাফলে আমাদের সব কষ্ট সার্থক মনে হচ্ছে।’
একজন মায়ের কাছে সন্তানের সাফল্যের চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে! যে ছেলের ভবিষ্যতের জন্য প্রতিদিন হিসাব করে সংসার চালিয়েছেন, সেই ছেলের অর্জনই আজ তাঁর সব ক্লান্তি আর কষ্ট ভুলিয়ে দিয়েছে। তবে আনন্দের পাশাপাশি রয়েছে নতুন স্বপ্নও—ছেলেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়ে উচ্চশিক্ষিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।
মুন্নার বাবা রফিকুল ইসলাম পেশায় একজন ইমারত নির্মাণশ্রমিক। তাঁর আয়ের ওপরই পরিবারের বড় একটি অংশ নির্ভরশীল। কিন্তু নির্মাণশ্রমিকের কাজ তো সব সময় মেলে না। কোনো দিন কাজ থাকে, কোনো দিন কাজের আশায় বসে থাকতে হয়। কাজ না থাকলে আয়ও বন্ধ হয়ে যায়। এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে সংসারের খরচ সামলে সন্তানের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া ছিল কঠিন।
তারপরও ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশা হারাননি রফিকুল ইসলাম। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে যতটুকু সম্ভব, ছেলের পড়াশোনার জন্য করেছেন। ছেলের ভালো ফলাফল যেন তাঁর দীর্ঘদিনের পরিশ্রমেরই এক আনন্দময় প্রতিদান।
রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ইমারত নির্মাণের কাজ সব সময় থাকে না। কোনো দিন কাজ পাই, আবার কোনো দিন বাড়িতে বসে থাকতে হয়। অভাবের সংসার হলেও ছেলেকে উচ্চশিক্ষিত করার স্বপ্ন কখনো ছাড়িনি। ছেলে ভালো ফল করেছে, এতে আমরা অনেক খুশি।’
বাবার জীবনের এই অনিশ্চয়তা আর মায়ের নিরন্তর সংগ্রাম খুব কাছ থেকে দেখেছেন মুন্না। তাই তাঁর কাছে ভালো ফলাফল অর্জন করাই শেষ কথা নয়; বরং বাবা-মায়ের ত্যাগের মর্যাদা রাখা এবং তাঁদের মুখে স্থায়ী হাসি ফোটানোই জীবনের বড় লক্ষ্য।
অভাবের কারণে কোনো কোচিং সেন্টারে ভর্তি হওয়ার সুযোগ হয়নি মুন্নার। অনেক শিক্ষার্থীর জন্য যেখানে বাড়তি প্রস্তুতি ও সহায়ক শিক্ষার সুযোগ থাকে, সেখানে তাঁকে নির্ভর করতে হয়েছে নিজের চেষ্টা, অধ্যবসায় এবং বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণার ওপর। প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করেই তিনি অর্জন করেছেন কাঙ্ক্ষিত ফলাফল।
নিজের সাফল্যের পেছনে বাবা-মায়ের অবদানের কথা স্মরণ করে মো. মোন্নাফ হোসেন মুন্না বলেন, ‘আমার বাবা-মা অনেক কষ্ট করে আমাকে পড়াশোনা করিয়েছেন। তাঁদের কষ্ট আমি কাছ থেকে দেখেছি। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেতে চাই। সেখানে পড়াশোনা করে প্রতিষ্ঠিত হতে পারলে বাবা-মায়ের জন্য কিছু করতে পারব—এটাই আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।’
মুন্নার কণ্ঠে তাই শুধু নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার আকাঙ্ক্ষা নয়, রয়েছে বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটানোর গভীর প্রত্যয়। যে বাবা রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে সংসারের জন্য উপার্জন করেন, যে মা সামান্য বেতনের মধ্যেও ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগাতে নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দেন—তাঁদের কষ্টের প্রতিদান দিতে চান তিনি।
মুন্নার জীবনের পথচলা এখন নতুন এক সন্ধিক্ষণে। এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জনের পর তাঁর সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন। কিন্তু উচ্চশিক্ষার এই পথেও রয়েছে আর্থিক বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ। সীমিত আয়ের পরিবারের পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির খরচ, পড়াশোনার ব্যয় এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের খরচ বহন করা সহজ নয়।
তবু মুন্না ও তাঁর বাবা-মায়ের স্বপ্ন থেমে নেই। তাঁদের বিশ্বাস, সুযোগ পেলে মুন্না আরও এগিয়ে যেতে পারবেন। তাঁর মেধা, পরিশ্রম ও অধ্যবসায়কে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত সুযোগ ও সহযোগিতা।
অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা মুন্নার এই সাফল্য প্রমাণ করে, আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায় মানুষকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নিতে পারে। তবে প্রতিভা বিকাশের জন্য প্রয়োজন সুযোগও। মুন্নার মতো মেধাবী শিক্ষার্থীরা যেন কেবল অর্থের অভাবে উচ্চশিক্ষার