
সোহেল খান দূর্জয়, নেত্রকোনা প্রতিনিধি
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার আদর্শনগরে প্রতি মঙ্গলবার বসে হাঁসের ডিমের জমজমাট হাট। হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশিতে বিচরণ করা হাঁসের ডিম ঘিরে গড়ে উঠেছে কোটি টাকার বাণিজ্য। সপ্তাহের এক দিনে এ হাটে বিক্রি হয় ৮ থেকে ১০ লাখ ডিম। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হিসাবে, এক দিনের লেনদেন পৌঁছে যায় প্রায় কোটি টাকায়। এ বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে হাওরাঞ্চলের বহু মানুষের, সচল হচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা।
ভোর থেকেই হাটে শুরু হয় ডিম কেনাবেচার ব্যস্ততা। খামারি, বিক্রেতা ও পাইকারদের হাঁকডাকে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। নেত্রকোনার মদন, খালিয়াজুড়ী ও মোহনগঞ্জসহ আশপাশের হাওরাঞ্চল থেকে ডিম নিয়ে আসেন খামারি ও ব্যবসায়ীরা। পার্শ্ববর্তী সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকেও আসে বিপুল পরিমাণ ডিম।
হাটে কেউ ডিম বাছাই করছেন, কেউ ঝুড়ি ও ক্যারেটে সাজাচ্ছেন। আবার কেউ ব্যস্ত পাইকারদের সঙ্গে দরদাম করতে। কেনাবেচা শেষে ডিমভর্তি ক্যারেট ও ঝুড়ি তোলা হচ্ছে ট্রাকে। সেখান থেকে এসব ডিম সরবরাহ করা হচ্ছে রাজধানীর তেজগাঁও, খিলগাঁও, খিলক্ষেতসহ বিভিন্ন পাইকারি বাজারে। এভাবেই হাওরের প্রত্যন্ত জনপদে উৎপাদিত ডিম পৌঁছে যাচ্ছে দেশের বড় বড় বাজারে।
স্থানীয়দের মতে, আদর্শনগরের এই হাট এখন শুধু ডিম কেনাবেচার স্থান নয়; এটি হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবিকা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র। হাঁস পালন, ডিম সংগ্রহ, বাছাই, পরিবহন ও বিপণন—প্রতিটি ধাপেই তৈরি হয়েছে আয়ের সুযোগ। সপ্তাহজুড়ে সংগৃহীত ডিম এক জায়গায় বিক্রির সুযোগ থাকায় খামারিদের পাশাপাশি লাভবান হচ্ছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরাও।
ডিম বিক্রেতা হালিক খান বলেন, “নেত্রকোনার বিভিন্ন উপজেলার পাশাপাশি সুনামগঞ্জ থেকেও এই হাটে প্রচুর ডিম আসে। অন্যান্য জায়গার তুলনায় এখানে ডিমের ভালো দাম পাওয়া যায়। এ কারণে খামারি ও ব্যবসায়ীদের কাছে দিন দিন হাটটির গুরুত্ব বাড়ছে।”
তবে সম্ভাবনাময় এ বাণিজ্যে রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। হাওরের দুর্গম এলাকা থেকে ডিম সংগ্রহ, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন ব্যয় এবং দীর্ঘ পথে ডিম ভেঙে যাওয়া বা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি ব্যবসায়ীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
হাটে ডিম কিনতে আসা পাইকারি ক্রেতা জামাল হোসেন বলেন, “ডিম সংগ্রহ থেকে শুরু করে বাজারে পৌঁছানো পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে খরচ হয়। পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে কিংবা বাজারে দাম কমে গেলে লাভের পরিমাণও কমে যায়। তবে নিয়মিত চাহিদা থাকায় এই হাটকে কেন্দ্র করে ডিমের বড় বাজার গড়ে উঠেছে।”
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নেত্রকোনায় বাণিজ্যিক হাঁসের খামার রয়েছে ১ হাজার ৭৬টি। এর বাইরে প্রান্তিক পর্যায়ে হাঁস পালন করছেন প্রায় ৪৯ হাজার ৭৮৮ জন খামারি বা পরিবার। জেলায় বছরে প্রায় ৪১ কোটি ৭০ লাখ ডিম বিক্রি হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫৬২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।
বিপুল এ উৎপাদন ও বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে মোহনগঞ্জের আদর্শনগরের সাপ্তাহিক ডিমের হাট। প্রতি মঙ্গলবার এখানে ৮ থেকে ১০ লাখ ডিম বিক্রি হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, এক দিনের লেনদেন প্রায় কোটি টাকা। ফলে হাটটি হাওরাঞ্চলের উৎপাদকদের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকারি বাজারের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি করেছে।
নেত্রকোনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম বলেন, “হাওরের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বিস্তীর্ণ জলাশয় হাঁস পালনের জন্য অত্যন্ত অনুকূল। এ অঞ্চলে হাঁসের ডিম উৎপাদনের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। উৎপাদন খরচ কমানো, পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন, খামারিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং বাজারজাতকরণে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা বাড়ানো গেলে এ খাত আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত বাজারব্যবস্থা, উন্নত যোগাযোগ ও খামারিদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে হাঁসের ডিমের বাণিজ্য হাওরাঞ্চলের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। একই সঙ্গে বাড়তে পারে গ্রামীণ মানুষের আয় এবং সৃষ্টি হতে পারে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ।
হাওরের জলরাশিতে হাঁসের বিচরণ থেকে শুরু হওয়া এ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখন কয়েক শ কোটি টাকার বাণিজ্যে বিস্তৃত হয়েছে। আদর্শনগরের সাপ্তাহিক ডিমের হাট সেই সম্ভাবনারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।