
শরিফুল আলম,ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধিঃ
দ্বিতীয় সন্তান জন্ম দেওয়ার মাত্র ১২ দিনের মাথায় জান্নাতুল নাহার (২৬) নামে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার রাজিবপুর ইউনিয়নের জিগাতলা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। স্বামীর পরিবারের দাবি, হঠাৎ শ্বাসকষ্টে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তবে নিহতের পরিবারের অভিযোগ, বিদেশ যাওয়ার জন্য দেড় লাখ টাকা না দেওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে জান্নাতুলকে নির্যাতন করতেন তাঁর স্বামী সাদ্দাম হোসেন। সন্তান প্রসবের আগে তাঁকে মারধর এবং পেটে লাথি মারারও অভিযোগ করেছেন স্বজনরা।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বিকেল ৪টার দিকে জান্নাতুলের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। পরে তাঁকে রাজিবপুর বাজারের একটি ফার্মেসিতে নেওয়া হলে অক্সিজেন দেওয়া হয়। এরপর হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। বুধবার সকালে ময়নাতদন্তের জন্য তাঁর মরদেহ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে পুলিশ।
নিহত জান্নাতুল নাহার উপজেলার রাজিবপুর ইউনিয়নের ভাটিচরণওপাড়া গ্রামের রুহুল আমিনের মেয়ে। প্রায় ৯ বছর আগে জিগাতলা গ্রামের প্রয়াত আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের সংসারে আট বছরের ছেলে জাকারিয়া এবং ১৩ দিন বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে।
নিহতের স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের ভাষ্য, মঙ্গলবার বিকেলে হঠাৎ জান্নাতুলের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। দ্রুত তাঁকে রাজিবপুর বাজারের একটি ফার্মেসিতে নেওয়া হয়। সেখানে অক্সিজেন দেওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।
স্থানীয় ফার্মেসির মালিক ও পল্লী চিকিৎসক খায়রুল ইসলাম কানন বলেন, ‘মঙ্গলবার বিকেলে রোগীকে আমার ফার্মেসিতে নিয়ে আসা হয়। তখন তাঁর শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। আমি অক্সিজেন দিয়ে দ্রুত হাসপাতালে নিতে বলি। হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তিনি মারা যান। আমার ধারণা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে রক্তশূন্যতা ও হিমোগ্লোবিন কমে গিয়ে তাঁর এমন অবস্থা হয়ে থাকতে পারে।’
তবে নিহতের বাবা রুহুল আমিন ও ভাই আজিজুল হক অভিযোগ করেন, প্রায় এক মাস আগে বিদেশ যাওয়ার কথা বলে সাদ্দাম তাঁর শ্বশুরের কাছে দেড় লাখ টাকা দাবি করেন। ওই টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় জান্নাতুলের ওপর নির্যাতন শুরু হয় বলে তাঁদের অভিযোগ।
আজিজুল হক বলেন, ‘টাকা না দেওয়াকে কেন্দ্র করে আমার বোনকে মারধর ও নানাভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। সন্তান প্রসবের কয়েকদিন আগে এরই জেরে আমার বোনের পেটে লাথি মারা হয়। পরে বিনা চিকিৎসায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে। আমরা মনে করি, সাদ্দাম ও তাঁর পরিবারের লোকজনই আমার বোনের মৃত্যুর জন্য দায়ী। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও সর্বোচ্চ বিচার চাই।’
নিহতের পরিবারের আরও অভিযোগ, গার্মেন্টসে চাকরি করার সময় সাদ্দাম সেখানে কর্মরত এক নারীকে গোপনে বিয়ে করেন। এ বিষয়টি নিয়েও তাঁদের সংসারে দীর্ঘদিন ধরে অশান্তি চলছিল।
পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, জান্নাতুল প্রায় ১২-১৩ দিন আগে দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দেন। সন্তান প্রসবের পর থেকেই তাঁর থেমে থেমে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। পরিবারের পক্ষ থেকে যথাযথ চিকিৎসা করানো হয়নি বলেও প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছে পুলিশ।
পুলিশের ধারণা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে জান্নাতুলের রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে যায়। পরে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।
ঈশ্বরগঞ্জ থানার পুলিশ জানায়, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহের সুরতহাল করা হয়। এ সময় মরদেহে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে জান্নাতুলের মৃত্যুর পর সাদ্দাম হোসেন ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বাড়িঘরে তালা দিয়ে চলে গেছেন বলে জানিয়েছেন নিহতের স্বজন ও স্থানীয়রা। সাদ্দামের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
ঈশ্বরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল আজম বলেন, ‘খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহের সুরতহাল সম্পন্ন করা হয়েছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা (ইউডি) রুজু করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।