
পারভেজ বাঙালী,চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি
ঋণের বিপুল টাকা পরিশোধের চাপ থেকে বাঁচতে নিজের অপহরণের নাটক সাজিয়েছিলেন এক ব্যক্তি। রামদা গলায় ঠেকিয়ে ১০ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ দাবির সেই সাজানো ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। তবে পুলিশের তদন্ত ও প্রযুক্তির ব্যবহারে অবশেষে উন্মোচিত হয়েছে সেই নিখুঁত নাটকের নেপথ্য কাহিনী।
গত ৭ জুলাই (মঙ্গলবার) ভোরে রাঙ্গুনিয়া থানা এলাকা থেকে আত্মগোপনে থাকা কথিত ভিক্টিম মোঃ রাশেদুল আলম (৩৮)-কে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেছে হাটহাজারী মডেল থানা পুলিশ। একই সাথে এই নাটকের দুই সহযোগীকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১ জুলাই বিকাল আনুমানিক ৩টার সময় মোঃ রাশেদুল আলমের স্ত্রী রীনা আক্তার (৩২) তার স্বামী নিখোঁজ হয়েছেন মর্মে হাটহাজারী মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এর দুই দিন পর তিনি থানায় এসে একটি ভিডিও প্রদর্শন করেন।
ভিডিওটিতে দেখা যায়, দুইজন ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র (রামদা) গলায় ধরে রাশেদুল আলমকে জিম্মি করে ১০ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ দাবি করছে। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে কিছু লোক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোরও চেষ্টা করে।
হাটহাজারী থানা পুলিশ জানায়,”জনমনে আতঙ্ক ছড়ানো এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে ভিক্টিমকে উদ্ধারে সর্বাত্মক অভিযানে নামে পুলিশ। প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, ভিডিও যাচাই এবং গোপন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে হাটহাজারী ও রাউজানসহ বিভিন্ন এলাকায় টানা অভিযান পরিচালনা করা হয়।”
টানা দুই দিনের শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান শেষে তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় রাঙ্গুনিয়া থানাধীন দক্ষিণ রাজানগর বাখরুঘাটা এলাকায় রাশেদুলের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। এরপর ৭ জুলাই ভোর আনুমানিক ৫:৩০ ঘটিকায় হাটহাজারী থানা পুলিশের একটি চৌকস দল সেখানে অভিযান চালিয়ে রাশেদুল আলমকে নিরাপদে উদ্ধার করে।
একই সময় তার এই সাজানো অপহরণ নাটকের দুই সহযোগী মোঃ ইমরান হোসেন (৩৫) এবং মোঃ ইব্রাহিম প্রকাশ বাপ্পি (৩২)-কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পুলিশ।
উদ্ধারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসে। কথিত ভিক্টিম মোঃ রাশেদুল আলম পুলিশের কাছে স্বীকার করেন যে, তিনি আসলে কোনো অপহরণের শিকার হননি।
তিনি বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিপুল অঙ্কের টাকা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। পাওনাদারদের ক্রমাগত চাপ থেকে রেহাই পেতে এবং পরিবারকে দিয়ে টাকা জোগাড় করাতেই তিনি এই আত্মগোপনের পরিকল্পনা করেন। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, তার দুই সহযোগীর সহায়তায় রামদা প্রদর্শন করে অপহরণের ভুয়ো ভিডিও ধারণ করা হয়, যা পরবর্তীতে মুক্তিপণ দাবির ভান করে বাস্তব রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।
হাটহাজারী থানা পুলিশের পেশাদারিত্ব ও বিচক্ষণতায় অল্প সময়ের মধ্যেই এই পরিকল্পিত অপহরণের নাটক উন্মোচিত হওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে স্থানীয় জনমনে।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সকলকে গুজব বা যাচাইবিহীন তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। পুলিশ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো কিংবা পুলিশকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে এ ধরনের সাজানো ঘটনা ও মিথ্যা তথ্য প্রচারের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।