
বিশেষ প্রতিবেদন
যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততা আর জীবিকার কঠিন লড়াইয়ের মাঝেও যারা সমাজকে সুন্দর করার স্বপ্ন দেখেন, হাজী নেকবর আলী তাদের মধ্যে একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। পেশায় তিনি একজন সাধারণ ট্রাক চালক হলেও, তার ভেতরের মানুষটি অসাধারণ। জীবনের দীর্ঘ সময় স্টিয়ারিং হুইল ঘুরিয়ে চাকা সচল রাখার পাশাপাশি তিনি পরম মমতায় রোপণ করে চলেছেন শতশত
গাছের চারা। সবুজায়নের এই অনন্য নেশা তাকে করে তুলেছে সমাজের এক অনন্য গুণীজন।
গুণীজন ট্রাক চালক হাজী নেকবর আলী রায়গঞ্জ উপজেলার চান্দাইকোনা ইউনিয়নের সিমলা পূর্ব পাড়া গ্রামে মৃত কাসেম আলীর পুত্র।
হৃদয়ে সবুজের টান হাজী নেকবর আলীর দিনের বেশির ভাগ সময় কাটে ট্রাকের কেবিনে, মহাসড়কের পিচঢালা কালো পিঠে। কিন্তু এই ব্যস্ত ও ক্লান্তিকর জীবনের আড়ালে রয়েছে তার এক সবুজ হৃদয়। তিনি যেখানেই যান, যে প্রান্তেই ট্রাক নিয়ে ছোটেন, তার চোখ জোড়া খুঁজে ফেরে গাছ লাগানোর উপযুক্ত খালি জায়গা। ধুলোবালি আর ইঞ্জিনের তপ্ত গরমের মাঝেও তিনি ভুলে যাননি প্রকৃতির প্রতি তার দায়বদ্ধতা। নিজের উপার্জিত অর্থের একটি অংশ তিনি ব্যয় করেন বিভিন্ন ফলজ, বনজ ও ওষুধি গাছের চারা কেনায়।
সর্বত্রই সবুজের ছোঁয়া নেকবর আলীর এই সবুজ বিপ্লব কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় আবদ্ধ নয়। গ্রামীণ রাস্তা থেকে শুরু করে মহাসড়কের পাশে যেখানেই খালি জায়গা পান, তিনি পরম মমতায় চারা রোপণ করেন। বিভিন্ন স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ ও ঈদগাহ মাঠের চারপাশে তিনি নিজ দায়িত্বে গাছ লাগিয়েছেন এবং সেগুলোর পরিচর্যা করছেন। রায়গঞ্জের ধানগড়া বাস স্ট্যান্ড এলাকায় যতগুলো গাছ লাগানো হয়েছে সবগুলো গাছই প্রায় তার হাতে লাগানো।
হাজী নেকবর আলী বলেন, মানুষ এবং তরুণ প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করতে নিজ খরচে চারা কিনে রোপণ করেন। “গাছ তো শুধু অক্সিজেন দেয় না, এটা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেঁচে থাকার গ্যারান্টি। আমি পেশায় চালক হতে পারি, কিন্তু প্রকৃতির প্রতি দায়িত্ব সবার সমান।”
গাছ লাগানোই শেষ কথা নয়, সেটিকে বাঁচিয়ে রাখাই আসল চ্যালেঞ্জ—এই নীতিতে বিশ্বাসী নেকবর আলী। ট্রাক চালিয়ে ফেরার পর যখন অন্য সহকর্মীরা বিশ্রাম নেন, তখন তিনি বেরিয়ে পড়েন তার লাগানো গাছগুলোর খোঁজে। কোনো গাছে পানি দেওয়া, কোনোটার চারপাশে বেড়া দেওয়া কিংবা ক্ষতিকারক কীট-পতঙ্গ থেকে গাছকে রক্ষা করার কাজগুলো তিনি নিজেই করেন। তার পরম যত্নে আজ বহু চারা বিশাল মহীরূহে পরিণত হয়েছে, যা পথিককে দিচ্ছে ছায়া আর পাখিদের দিচ্ছে আশ্রয়।
স্বাধীন জীবনের নির্বাহী পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক নাসিম বলেন, হাজী নেকবর আলীর এই নিঃস্বার্থ উদ্যোগ স্থানীয় এলাকায় ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। তাকে দেখে এলাকার অনেক যুবক ও শিক্ষার্থী এখন বৃক্ষরোপণে এগিয়ে আসছে ।কোনো সরকারি অনুদান বা বড় প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছাড়াই একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ যেভাবে পরিবেশ রক্ষায় অবদান রাখছেন, তা সত্যি রূপকথার মতো।
রায়গঞ্জ উপজেলা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক সেলিম রেজা বলেন,তিনি প্রমাণ করেছেন, পরিবেশকে ভালোবাসার জন্য বড় কোনো ডিগ্রি বা অঢেল সম্পদের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন শুধু একটি সুন্দর ও সবুজ মনের।
রায়গঞ্জ উপজেলা সদর ধানগড়া মহিলা ডিগ্রি কলেজ পরিচালনা কমিটির সদস্য সাইফুল্লাহ ইবনে সাঈদ সজল বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের এই সংকটাপন্ন সময়ে হাজী নেকবর আলীর মতো মানুষদের আমাদের বড্ড বেশি প্রয়োজন।