
ন্যাশনাল ডেস্ক
রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে স্টিয়ারিং হাতে দিনভর লড়াই করা একজন সাধারণ বাসচালকের একটি ভিডিও বক্তব্য হাজার হাজার মানুষের মনে ‘গভীর ও অপ্রিয়’ সত্যের জন্ম দিয়েছে। বছরের পর বছর হাফ ভাড়ায় যাতায়াত করা শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পরিবহন শ্রমিকদের ‘তুচ্ছতাচ্ছিল্য ছাড়া’ আর কী করেন, এমন প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তার বক্তব্যে সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন অনেকে, আবার কেউ কেউ বলছেন, এটি রাষ্ট্রের নীতির অংশ, ব্যক্তিগত অনুগ্রহ নয়।
রোববার (২১ জুন) এটিএন বাংলা ডিজিটালের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওটি থেকে ওই বাসচালকের নাম কিংবা পরিচয় জানা যায়নি। তাকে বলতে শোনা যায়, ‘সর্বনিম্ন ২০ বছর পিঠে কইরা বহন করি বা গাড়িতে কইরা বহন করি। এই স্টুডেন্টরা প্রতিষ্ঠিত হইয়া আমাদের সাধারণ শ্রমিকদের জন্য কী করছে?’
পরিবহন শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে বিভিন্ন সময় তাত্ত্বিক আলোচনা হলেও একজন শ্রমিকের মুখে এ ধরনের প্রশ্ন অনেকের কাছেই নতুন মনে হয়েছে। ভিডিওটির নিচে হাজারো মন্তব্যে নেটিজেনরা লিখেছেন, ছাত্রজীবনে দীর্ঘ সময় তারা হাফ ভাড়ার সুবিধা নিয়েছেন, কিন্তু এর পেছনে শ্রমিকদের ত্যাগ বা আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি কখনো এভাবে ভাবেননি।
চালকের বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা ও তার প্রতিদান নিয়ে প্রশ্ন। তার ভাষ্য, একজন শিক্ষার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রায় দুই দশক হাফ ভাড়ার সুবিধা ভোগ করে। এই সময়ে পরিবহন শ্রমিকরা তাদের শিক্ষাজীবন সহজ করতে ভূমিকা রাখেন। কিন্তু সেই শিক্ষার্থী যখন পড়াশোনা শেষ করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হন, তখন শ্রমিকদের জন্য তাদের কোনো অবদান চোখে পড়ে না।
তার যুক্তির সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল পেশাগত সম্পর্ক ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে। তিনি বলেন, যে শিক্ষার্থী একসময় হাফ ভাড়ায় বাসে চলাচল করেছে, সে পরে ডাক্তার, প্রকৌশলী, পুলিশ কর্মকর্তা কিংবা বিচারক হয়। কিন্তু কোনো দিন কি তারা পরিবহন শ্রমিকদের জন্য তাদের সেবার মূল্য কমিয়েছে? চালকের ভাষায়, অসুস্থ হয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলে তাকেও অন্যদের মতো পূর্ণ ফি দিতে হয়, যদিও সেই চিকিৎসক একসময় তার কাছ থেকে হাফ ভাড়ার সুবিধা নিয়েছেন।
‘উনি ১০ জনের থেকে যে ভিজিট নিছেন, আমার থেকেও একই ভিজিট নিছেন; কিন্তু আমার কাছে তো ২০ বছর উনি সুবিধা নিছেন,’ বলেন তিনি।
ভিডিওটিতে পরিবহন শ্রমিকদের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির কথাও উঠে এসেছে। চালকের দাবি, তারা শিক্ষার্থীদের নিজের ভাতিজা, ভাগিনা, ছোট ভাই কিংবা সন্তানের মতো দেখেন। নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর অনেকেই সেই শ্রমিকদের প্রতি অবজ্ঞার মনোভাব দেখান।
তার অভিযোগ, ভাড়া বা অন্য কোনো বিষয় নিয়ে সামান্য বিরোধ তৈরি হলেই অনেক সময় শিক্ষার্থীরা দলবদ্ধ হয়ে বাস আটকে দেন, শ্রমিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং মালিকপক্ষের কাছে অভিযোগ তুলে শাস্তির ব্যবস্থা করেন। ‘যখন একটু সামান্য ব্যাঘাত ঘটে তখন তারা ভাবে না যে এটা আমার বাবা হইতে পারে বা বড় ভাই হইতে পারে,’ বলেন ওই চালক।
তবে ভিডিওটির মন্তব্যঘরে সবাই যে চালকের সঙ্গে একমত হয়েছেন, তা নয়। অখিল মাহমুদ নামের একজন লিখেছেন, ‘এটা সরকারি নীতি। দেশে চলতে হলে আইন মানতেই হবে। স্টুডেন্টদের প্রতিদিন চলতে হয়। এরাই বড় হয়ে দেশের কাজে লাগে। দেশের স্বার্থে এতটুকু করতেই হবে।’
অখিল মাহমুদকে আরেকজন আবার এভাবে রিপ্লাই দিয়েছেন, ‘এসব বাধ্যকর আইন কি শুধু গরিব শ্রমিকদের জন্যই?’