
দৃশ্যপট ডেস্ক রিপোর্ট
মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে সিরাজগঞ্জে ৪ জন শিশু ধর্ষণ ও বলাৎকারের শিকার হয়েছে। এছাড়াও আরও দুই শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। সিরাজগঞ্জ সদর, শাহজাদপুর, চৌহালী ও উল্লাপাড়া উপজেলায় এসব ঘটনা ঘটে। লোমহর্ষক এসব ঘটনায় অভিভাবকদের মাঝে শুরু হয়েছ আতঙ্ক।
২১ এপ্রিল শাহজাদপুরের বাড়াবিল গ্রামে চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রী নয় বছর বয়সী এক শিশুকে হাত-পা বেধে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে সজীব নামে এক যুবকের বিরুদ্ধে। এ সময় শিশুটির দুই সহপাঠীকেও বিবস্ত্র করে যৌন নিপীড়ন করে সে।
রোববার (২৬ এপ্রিল) নির্যাতিত শিশুটির মা বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার একমাত্র আসামি সজীব শাহজাদপুর উপজেলার বাড়াবিল গ্রামের হাফেজ আব্দুল হাইয়ের ছেলে।
শিশুটির মা বলেন, ২১ এপ্রিল দুপুরে আম দেওয়ার কথা বলে সজীব তিন স্কুলছাত্রীকে ডেকে নিয়ে যায়। বাড়িতে তার পরিবারের কেউ না থাকার সুবাদে তিন শিশুকে ডেকে নিজের ঘরে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। প্রথমে হাত-পা বেঁধে ৩ শিশুকেই বিবস্ত্র করে যৌন নিপিড়ন চালায়। পরে দুজনকে বিছানার পাশে দাঁড় করিয়ে রেখে তার মেয়েকে ধর্ষণ করে। ধর্ষণের পর ঐ তিন শিশুকে ৩শ টাকা দেয় এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। তবে ৩ শিশু টাকা না নিয়ে ঐ বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে স্বজনদের জানায়।
বিষয়টি এলাকার প্রধানদের অবগত করলে রোববার (২৬ এপ্রিল) শালিসের আয়োজন করা হয়। তবে শালিসে অভিযুক্ত সজীব ও তার বাবা আসে না। জানতে পেরে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে শালিস পণ্ড হয়ে যায়।
শাহজাদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম জানান, এক শিশুকে ধর্ষণের পাশাপাশি আরও দুই শিশুকে যৌন নির্যাতনের ঘটনায় মামলা দায়ের হয়েছে। ভিকটিমকে ডাক্তারি পরীক্ষা ও জবানবন্দির জন্য সিরাজগঞ্জ কোর্টে পাঠানো হয়েছে। আসামিকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
২৩ এপ্রিল সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলায় আতা ফল খাওয়ার লোভ দেখিয়ে ৫ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে দুই কিশোরের বিরুদ্ধে। উপজেলার বাঘুটিয়া ইউনিয়নের রেহাইপুখুরিয়া পশ্চিম পাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। অভিযুক্তরা হলো রেহাইপুখুরিয়া গ্রামের কালাম বেপারির ছেলে কাউসার হোসেন ও ফজলুল হকের ছেলে রহিম রেজা।
শিশুটির দাদী জানান আতাফল দেয়ার কথা বলে তার নাতনিকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায় রহিম ও কাউসার। বাড়ি ফিরলে শিশুটিকে অস্বাভাবিক লাগে এবং তার শরীরে রক্ত ঝরতে দেখা যায়। জিজ্ঞেস করলে তার সাথে কি হয়েছে সব খুলে বলে।
চৌহালী থানার ওসি মো. মোশারফ হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ওই ধর্ষণের ঘটনার আসামি রহিমকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বাকী আসামিকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
২০ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কানগাঁতী গ্রামে মোবাইলের প্রলোভন দেখিয়ে ডেকে নিয়ে ৫ বছর বয়সী এক শিশু বলাৎকার করে রিফাত নামে এক তরুণ। পাশবিক নির্যাতনে শিশুটির পায়ুপথ ছিড়ে যায়। এ ঘটনায় ২২ এপ্রিল মামলা দায়ের হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোন আসামি গ্রেপ্তার হয়নি।
নির্যাতিত শিশুটির বাবা বলেন, সোমবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তার ৫ বছর বয়সী ছেলেকে মোবাইল দেখানোর লোভ দেখিয়ে নিজেদের বাড়ির ছাদে নিয়ে যায় রিফাত। এরপর শিশুটির উপর পায়ুপথে জোরপূর্বক পাশবিক নির্যাতন করে। এ সময় শিশুটি চিৎকার করলে তাকে ছাদ থেকে নীচে নামিয়ে দেয় এবং ভয় দেখিয়ে বিষয়টি কাউকে জানাতে নিষেধ করে। আতংকে শিশুটি তার পরিবারকে ঘটনার কথা জানাতে পারেনি। রাতে শিশুটির মা কোলে নেওয়ার সময় পায়ুপথে ব্যাথা লাগায় চিৎকার করে। তখন পরিবারের লোকজন প্যান্ট খুলে পায়ুপথ ছেড়া ও রক্তাক্ত দেখতে পায়। এ সময় নির্যাতিত শিশুটি কাঁদতে কাঁদতে ঘটনাটি জানায়।
পরে বিষয়টি মুরুব্বীদের জানালে তারা বিচার দেওয়ার আশ্বাস দেয়। মুরব্বীদের পরামর্শে হাসপাতালে নিয়ে আসলে ডাক্তার ফিরিয়ে দিয়ে বলে, আগে পুলিশ কেস করতে হবে। পরে স্থানীয় পল্লী চিকিৎসকের কাছ থেকে ওষুধ কিনে খাওয়ানো হয়।
পরদিন মঙ্গলবার মুরুব্বীরা শালিসের আয়োজন করলেও অভিযুক্তরা অনুপস্থিত হয়। এ ঘটনায় বুধবার থানায় মামলা দায়ের করা হয়। ওইদিন ডাক্তারি পরীক্ষা করানোর হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় শুক্রবার সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে।
সদর থানার ওসি মো. রাকিবুল ইসলাম বলেন, শিশুটি বলাৎকারের বিষয়ে থানায় মামলা দায়ের হয়েছে। আমরা মেডিকেল রিপোর্টের জন্য পাঠিয়েছি। এ ঘটনায় বুধবার মামলা দায়ের হয়েছে।
২১ এপ্রিল উল্লাপাড়ায় দশ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীকে বলাৎকারের অভিযোগে মো. শাহ জালাল নামে এক মাদ্রাসা শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, সোনতলা বাজারে গড়ে তোলা ইন্টারন্যাশনাল কওমি হেফজ মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন শাহ জালাল। ২১ এপ্রিল রাতে ওই প্রতিষ্ঠানের ১০ বছর বয়সী এক ছাত্রকে জোরপূর্বক যৌন নির্যতান করেন তিনি। এ সময় নির্যাতিত শিক্ষার্থী আহত হয়। বিষয়টি স্বজনেরা জানতে পেরে মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটিকে অবহিত করেন। জানাজানি হলে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্ত শিক্ষককে মাদ্রাসার ভেতরে অবরুদ্ধ করে আটকে রাখে। বুধবার সোনতলা গ্রাম থেকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
উল্লাপাড়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রুপ কর এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, ছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগে শিক্ষক শাহজালালের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে। আমরা তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
এসব বিষয়ে আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অ্যাডভোকেট মাহবুব এ খোদা টুটল বলেন, সম্প্রতি শিশু নির্যাতন অতিমাত্রা বেড়ে গেছে। এক সপ্তাহের মধ্যে ৪টি ঘটনা সিরাজগঞ্জ আলোড়িত করেছে। অভিভাবকদের মাঝে আতংক বিরাজ করছে। শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সকলকে সচেতন, সোচ্চার হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এসব ঘটনায় দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।