
আব্দুল্লাহ আল নোমান, আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি:
দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে বেহাল দশায় পড়ে আছে বরগুনা আমতলী পৌর শহরের ঐতিহ্যবাহী টাউন হল। ২০০৭ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতে ভবনটির টিনের চালা উড়ে যাওয়ার পর আর উল্লেখযোগ্য সংস্কার হয়নি। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে এখন অনেকটাই পরিত্যক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।
আমতলী উপজেলা শহরে সভা-সমাবেশ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক, সামাজিক ও নাগরিক আয়োজনের জন্য আধুনিক কোনো অডিটরিয়াম নেই। এ অবস্থায় ঐতিহ্যবাহী টাউন হলটি দ্রুত সংস্কার ও আধুনিকায়ন করে জনসাধারণের ব্যবহারের উপযোগী করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, সাংস্কৃতিক কর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
স্থানীয়দের কাছে টাউন হলটি শুধু একটি পুরোনো ভবন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমতলীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের দীর্ঘ ইতিহাস। একসময় এ ভবন ও এর চত্বর ছিল সভা-সমাবেশ, নাটকের মহড়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র। সময়ের পরিক্রমায় সেই ব্যস্ততা হারিয়ে ভবনটি এখন অতীতের স্মৃতি বহন করে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৩ সালের মে মাসে তৎকালীন সরকার দেশের প্রতিটি থানায় একটি করে অডিটরিয়াম নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। ওই কর্মসূচির আওতায় আমতলীকে অন্তর্ভুক্ত করেন তৎকালীন সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন আহমেদ তালুকদার। জায়গা নির্ধারণ ও অর্থ বরাদ্দের পর ওই বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বরে নির্মাণকাজ শুরু হয়। পরে অডিটরিয়ামটির নাম দেওয়া হয় ‘আমতলী টাউন হল’।
নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন স্বাধীনতার পর আমতলী থানার প্রথম বেসরকারি ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম পাশা তালুকদার। বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন আহমেদ তালুকদারের পরামর্শে বীর মুক্তিযোদ্ধা আমির হোসেন গাজী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আতাহার উদ্দিন আকন টাউন হলের নকশা প্রস্তুত করেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর নির্মাণকাজ থমকে যায়। দীর্ঘ সময় পরিত্যক্ত থাকার পর ১৯৭৭ সালের দিকে বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ শাহ আলম তালুকদারের উদ্যোগে স্থানীয়ভাবে চাঁদা তুলে সেখানে একটি ব্যায়ামাগার চালু করা হয়। কিছুদিন পর সেটিও বন্ধ হয়ে যায়।
১৯৮৬ সালে উপজেলা পরিষদ টাউন হলটি সংস্কারের উদ্যোগ নিলে স্থানীয় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়। তবে পরে সেখানে সিনেমা হল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ নিয়ে স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীরা আন্দোলন গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান শামসুল আলম তালুকদারের সময়ে সেখানে ‘সুরভি সিনেমা হল’ চালু হয়।
দীর্ঘদিন চলার পর ব্যবসায়িকভাবে সফল না হওয়ায় সিনেমা হলটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে হলদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ মাহবুব উল আলম ঝুন্টু তালুকদারের পরামর্শে সাংবাদিক বাহাদুর খানসহ স্থানীয় তরুণরা উপজেলা পরিষদের অর্থায়নে টাউন হলের মঞ্চসহ কিছু অংশ সংস্কার করেন। এরপর আমতলী উদীচী, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও একতা ক্লাবের উদ্যোগে সেখানে নাটকের মহড়া ও মঞ্চায়ন শুরু হয়।
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভবনটি আবার ‘লাভলু সিনেমা হল’ নামে চালু হয়। ২০০৪ সালে তৎকালীন সংসদ সদস্য মতিয়ার রহমান তালুকদারের নির্দেশে সিনেমা হলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর তিন বছর পর ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতে ভবনটির টিনের চালা উড়ে যায়। এরপর থেকে উল্লেখযোগ্য সংস্কার না হওয়ায় ধীরে ধীরে ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, আমতলী শাখার সভাপতি অশোক মজুমদার বলেন, ‘আমতলীর সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একসময় প্রাণকেন্দ্র ছিল এই টাউন হল। পহেলা বৈশাখ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, মহান বিজয় দিবস ও মহান স্বাধীনতা দিবসসহ বিভিন্ন জাতীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো এখানে। দেশাত্মবোধক গান, নাটক ও আবৃত্তির মহড়া ও মঞ্চায়নেও মানুষের ব্যাপক সমাগম হতো। বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি চর্চার জন্য টাউন হলটি পুনরায় সংস্কার করা জরুরি।’
মানবাধিকারকর্মী আবদুর রহমান সালেহ বলেন, ‘আমতলীর ঐতিহ্যবাহী টাউন হলটি দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। সরকারি উদ্যোগে এটি সংস্কার ও মেরামত করা হলে ভবনটি আবার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হতে পারে। এতে নাগরিকরাও উপকৃত হবেন।’
আমতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক হাফিজুর রহমান বলেন, ‘টাউন হলটি কীভাবে সুন্দর, নান্দনিক ও জনগণের ব্যবহারের উপযোগী করা যায়, সে বিষয়ে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। টাউন হলটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে এনে নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এর ঐতিহ্য ও নান্দনিকতা সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় সংস্কার ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে আমতলীর ঐতিহ্যবাহী টাউন হলটি আবারও সভা-সমাবেশ, সাংস্কৃতিক চর্চা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠবে।