
অনলাইন ডেস্ক
ডায়াবেটিস রোগীদের দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো রক্তে শর্করার (ব্ল্যাড সুগার) পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রেখে পুষ্টিকর খাদ্যতালিকা বজায় রাখা। বিশেষ করে আমাদের প্রাত্যহিক খাদ্যাভ্যাসে রুটি একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও স্বাভাবিক অনুষঙ্গ। তবে ডায়াবেটিস শনাক্ত হওয়ার পর অনেকেই ভয়ে খাদ্যতালিকা থেকে রুটি পুরোপুরি বাদ দিয়ে দেন।
সম্প্রতি ভারতীয় গণমাধ্যম ‘এনডিটিভি ফুড’-এ প্রকাশিত এক বিশেষ স্বাস্থ্য প্রতিবেদনে এ সাধারণ ধারণার বিপরীতে আলোকপাত করা হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে বিশেষজ্ঞরা জানান, ডায়াবেটিস হলে রুটি খাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং আটার উপাদান, প্রসেসিং এবং ফাইবারের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে সঠিক রুটি নির্বাচন করতে পারলে তা রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
ভারতের উদয়পুর-ভিত্তিক প্রখ্যাত পুষ্টিবিদ, হেলথ কোচ এবং ‘রিধিমা খামেসরাস ডায়েট ক্লিনিক’-এর প্রতিষ্ঠাতা ড. রিধিমা খামেসরা এনডিটিভি ফুড-কে জানান যে, খাদ্যতালিকা থেকে রুটি একেবারে মুছে ফেলা কখনোই সঠিক সমাধান হতে পারে না। রক্তে শর্করার মাত্রা সঠিক রাখতে কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্স এবং উচ্চ ফাইবারযুক্ত আটা নির্বাচন করাই আসল কৌশল। যেসব শস্যে প্রচুর ফাইবার ও প্রোটিন থাকে, তা পরিপাক প্রক্রিয়াকে ধীরগতি করে শরীরে শর্করা শোষণের হার কমায়।
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বিশেষজ্ঞের নির্দেশিত ৪ ধরনের রুটি
চিকন ও মোটা চালের মধ্যে কোনটি বেশি স্বাস্থ্যকর? জানালেন পুষ্টিবিদ
ড. রিধিমা খামেসরা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সাধারণ মিহি আটার বিকল্প হিসেবে প্রধানত ৪ ধরনের রুটি খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন:
১. জবের রুটি
জবের আটার রুটি ডায়াবেটিস রোগীদের স্বাস্থ্যরক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর। জবে ‘বিটা-গ্লুকান’ নামক এক ধরনের দ্রবণীয় ফাইবার থাকে, যা হজম প্রক্রিয়াকে ধীরগতির করে এবং রক্তে গ্লুকোজের দ্রুত শোষণ রোধ করে।
৩১টি সুনিয়ন্ত্রিত ট্রায়ালের ওপর ২০১৬ সালের একটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, জব বা বার্লি জাতীয় খাবার খেলে খাওয়ার পরপরই রক্তে গ্লুকোজ ও ইনসুলিনের যে তাৎক্ষণিক বৃদ্ধি ঘটে, তা অনেকটাই হ্রাস পায়।
২. ভূসিসহ গমের রুটি
প্রক্রিয়াজাত বা পরিশোধিত সাদা আটার (ময়দা/মিহি আটা) পরিবর্তে ভূসি যুক্ত লাল গমের আটার রুটি খাওয়া বেশি স্বাস্থ্যকর। ভূসি ছেঁকে না ফেলে রেখে দিলে গমের প্রাকৃতিক শস্য আঁশ বা ফাইবার বজায় থাকে।
গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্যে ফাইবারের পরিমাণ বাড়ালে ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তিদের খালি পেটের রক্তের শর্করা পরিচালনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়।
৩. বাজরা, জোয়ার ও রাগির রুটি
জোয়ার, বাজরা ও রাগির মতো ‘মিলেট’ বা জোয়ার জাতীয় দানাদার শস্যের রুটি ডায়াবেটিকবান্ধব খাদ্য হিসেবে বিবেচিত। রিফাইন্ড আটা বা চালের তুলনায় মিলেটের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI) সাধারণত কম হয়ে থাকে। মিলেটভিত্তিক খাবার টাইপ-২ ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তিদের গ্লাইসেমিক প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
৪. বেসনের রুটি
ছোলার আটা বা বেসন থেকে তৈরি রুটিতে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন এবং ফাইবার থাকে। ছোলার ওপর ভিত্তি করে করা গবেষণায় দেখা গেছে, সমপরিমাণ কার্বোহাইড্রেটযুক্ত অন্যান্য খাবারের তুলনায় ছোলার তৈরি খাবার খাওয়ার পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কম বাড়ে।
কেন ফাইবার এবং গ্লাইসেমিক ইনডেক্স এত গুরুত্বপূর্ণ?
ফাইবারের ভূমিকা: ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার পরিপাকনালিতে কার্বোহাইড্রেট ভাঙার গতি কমিয়ে দেয়। খাদ্যে ফাইবারের পরিমাণ বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে রক্তে শর্করার সূচক এবং খালি পেটের রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে বেশ সাহায্য করে।
গ্লাইসেমিক ইনডেক্স: গ্লাইসেমিক ইনডেক্স নির্দেশ করে একটি খাবার খাওয়ার পর তা কত দ্রুত রক্তের গ্লুকোজ বাড়িয়ে দেয়। কম-জিআই সমৃদ্ধ খাবার খেলে রক্তে শর্করার হঠাৎ মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি রোধ হয়।
তবে পুষ্টিবিদরা মনে করিয়ে দেন, কেবল আটার ধরন নির্বাচন করাই যথেষ্ট নয়। খাবার গ্রহণের পরিমাণ, রুটি তৈরির প্রণালি এবং রুটির সাথে অন্য কী খাবার খাওয়া হচ্ছে, তার ওপরও সামগ্রিক গ্লুকোজ প্রতিক্রিয়া নির্ভর করে।