
মোঃ এনামুল মন্ডল, রাজবাড়ী প্রতিনিধি
রাজবাড়ীর কালুখালী রেলওয়ে স্টেশনে টানা ছয় বছর ধরে ট্রেনের তৃষ্ণার্ত যাত্রীদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পানি পান করিয়ে আসা মানবিক মানুষ মুন্নু শেখকে সম্মাননা ও আর্থিক সহায়তা দিয়েছে কালুখালী উপজেলা প্রশাসন।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকাল ১১টায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মেজবাহ উদ্দিন তাঁর কার্যালয়ে মুন্নু শেখের হাতে এই সম্মাননা ও আর্থিক অনুদান তুলে দেন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুন্নু শেখের এই ব্যতিক্রমী মানবিক উদ্যোগের বিষয়টি ছড়িয়ে পড়লে তা উপজেলা প্রশাসনের নজরে আসে। তাঁর এই নিঃস্বার্থ মানবসেবার স্বীকৃতি হিসেবেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়।
কালুখালী উপজেলার রতনদিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম রতনদিয়া গ্রামের বাসিন্দা মুন্নু শেখ পেশায় একজন চটপটি বিক্রেতা। প্রায় ২০ বছর ধরে কালুখালী স্টেশনের পাশে ছোট্ট একটি চটপটির দোকান চালিয়ে তিনি জীবিকা নির্বাহ করছেন। তবে প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝেও প্রায় দুই ঘণ্টা নিজের দোকান বন্ধ রেখে তিনি কালুখালী রেলওয়ে স্টেশনে ছুটে যান। ট্রেনের তৃষ্ণার্ত যাত্রীদের মুখে তুলে দেন ঠান্ডা পানি। মানুষের দোয়া ও ভালোবাসাকেই তিনি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে মনে করেন।
মুন্নু শেখের এই নিঃস্বার্থ মানবসেবার পেছনে লুকিয়ে আছে এক বুকফাটা আর্তনাদ ও বেদনাময় স্মৃতি। ২০১৮ সালে তাঁর নয় বছর বয়সী ছেলে সবুজ শেখ ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। ছেলের চিকিৎসার জন্য নিয়মিত ট্রেনে করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাতায়াত করতে হতো মুন্নু শেখকে। একপর্যায়ে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে তিনি এতটাই নিঃস্ব হয়ে পড়েন যে, ছেলের জন্য এক বোতল পানি কেনার সামর্থ্যও তাঁর ছিল না। দীর্ঘ দুই বছর ক্যানসারের সাথে লড়াই করে ২০২০ সালে মারা যায় ফুটফুটে শিশু সবুজ।
ছেলের মৃত্যুর পর সেই তীব্র শোককে শক্তিতে রূপান্তর করেন মুন্নু শেখ। ট্রেনের কোনো যাত্রীকে যেন পানির জন্য কষ্ট পেতে না হয়—সেই অঙ্গীকার থেকে ছেলের স্মৃতিতে শুরু করেন বিনামূল্যে পানি পান করানোর এই মানবিক মিশন।কালুখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মেজবাহ উদ্দিন বলেন,
“মুন্নু শেখের মতো মানুষ সমাজের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। নিজের সীমিত আয়ের মধ্যেও তিনি যেভাবে বছরের পর বছর ধরে মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তাঁর এই মানবিক উদ্যোগকে সম্মান জানাতেই উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সামান্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। সমাজের বিত্তবানরা যদি তাঁর পাশে দাঁড়ান, তবে তিনি আরও সুন্দর ও বড় পরিসরে এই সেবামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবেন।”
স্থানীয়দের মতে, মুন্নু শেখের এই নিঃস্বার্থ উদ্যোগ শুধু তৃষ্ণার্ত মানুষের পিপাসাই মেটাচ্ছে না, বরং বর্তমান সমাজে মানবতার এক উজ্জ্বল ও অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।