
মোঃ মোফাছসিল খান, নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের বার্তা নিয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে দিনব্যাপী ‘আদিবাসী উৎসব ২০২৬’। ৫ নভেম্বর বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত নাচ, গান, গল্প ও ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো ক্যাম্পাস।
থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের ১৭তম আবর্তনের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা ইভেন্ট ও প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কোর্সের অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আদিবাসী শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় উৎসবটির আয়োজন করেন। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, শিল্প ও জীবনধারা সবার সামনে তুলে ধরা এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সম্প্রীতি বাড়ানোই ছিল এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।
সকালে গারোদের জুম নাচ এবং আদিবাসী গান ও নৃত্যের মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হয়। উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. ইসমত আরা ভূঁইয়া ইলা। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
উদ্বোধনের পর সকাল ১১টা থেকে আদিবাসী শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে আড্ডা অনুষ্ঠিত হয়। পরে সকাল ১১টা ৪৫ মিনিটে ‘বহমান আমারও পদচিহ্ন’ শীর্ষক অনুভূতি বিনিময় পর্বে অতিথিরা নিজেদের অভিজ্ঞতা, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ঐতিহ্যের নানা দিক তুলে ধরেন।
দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে ঐতিহ্যবাহী ঘিলা খেলার মধ্য দিয়ে শুরু হয় উৎসবের দ্বিতীয় পর্ব। বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত পরিবেশিত হয় মারমা রূপকথার গল্প। আসরের নামাজের বিরতির পর বিকেল সাড়ে ৪টায় শব্দকুঞ্জের পরিবেশনায় আবৃত্তি অনুষ্ঠিত হয়। এরপর বিকেল ৪টা ৫০ মিনিট থেকে ৫টা ২০ মিনিট পর্যন্ত মাহফুজ ও বিপুনের কণ্ঠে পরিবেশিত হয় আদিবাসী গান।
সন্ধ্যা ৫টা ৪০ মিনিটে আদিবাসী নৃত্য পরিবেশনের পর ড্রামা চেম্বারের পরিবেশনায় মঞ্চস্থ হয় নাটক ‘নামের সুতো’। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় অনুষ্ঠিত হয় বোতল নৃত্য। এরপর ড্যান্স ক্লাবের পরিবেশনা, ষড়ঙ্গের পরিবেশনাসহ বিভিন্ন আদিবাসী নৃত্য ও সংগীতের আয়োজনে রাত পর্যন্ত উৎসবস্থল প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
উৎসবে অংশ নিয়ে আনন্দ ও সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন আদিবাসী শিক্ষার্থীরা। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শুভ্রতং চাকমা বলেন, “অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে আমি অনেক আনন্দিত। এ আয়োজনের মাধ্যমে আমাদের সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাস সাধারণ শিক্ষার্থী ও অন্য দর্শনার্থীদের কাছে তুলে ধরা হচ্ছে। তাছাড়া এ অনুষ্ঠান একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনাও বহন করছে।”
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী কুমলাউ আরেং বলেন, “প্রথমবারের মতো নিজের সংস্কৃতিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পেরে খুবই ভালো লাগছে। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ও তাদের সংস্কৃতি সমতলের সবার কাছে তুলে ধরার মাধ্যমে আমাদের বিষয়গুলো আরও গুরুত্ব পাচ্ছে।”
একই বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সুমাইয়া চিরাং বলেন, “এমন একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া আমাদের জন্য গর্বের। এর মাধ্যমে আমাদের সংস্কৃতি স্বাচ্ছন্দ্যে সবার কাছে তুলে ধরা যাচ্ছে। আদিবাসীদেরও যে আলাদা সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাস রয়েছে, তা সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে।”
বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারার সম্মিলনে আয়োজিত এ উৎসব বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে।