
পলাশ চন্দ্র সরকার,মান্দা (নওগাঁ) প্রতিনিধি
নওগাঁর মান্দা উপজেলার বুড়িদহ বাজারে জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা উপলক্ষে বিশাল মেলার আয়োজন হয়ে আসছিল শতবছর ধরে। মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল মাটির তৈরি পুতুল, খেলনা ও মিষ্টির দোকান। এছাড়া বাঁশ ও বেঁতের তৈরি সামগ্রী, কৃষিপণ্য, নাগরদোলা, সার্কাস, যাত্রাপালা, কবিগান, বাউল গান ও কীর্তনের মতো নানা লোকজ আয়োজন ছিল মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।
কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গেছে সেই আয়োজন। অন্তত দুইদশক ধরে বন্ধ হয়ে গেছে ঐতিহ্যবাহী এই মেলাটি। পিতলের তৈরি শতবর্ষী যে রথটিকে ঘিরে এই আয়োজন ছিল তার অবস্থাও অত্যন্ত জীর্ণশীর্ণ। বুড়িদহ বাজারে থাকাবস্থায় এর অনেক মূল্যবান মূর্তি চুরি হয়ে যায়। পরে স্মৃতি রক্ষায় রথটিকে নেওয়া হয় প্রতিষ্ঠাতা নিভর্ষী মোহন প্রামাণিকের উত্তরসূরীদের খলিয়ানে।
আষাঢ মাসের শুক্লা পক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে আগামিকাল বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) জগন্নাথ দেবের সেই রথের টান দেওয়া হবে। রথটি বহন করছে এ এলাকার এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। তবে বুড়িদহ বাজারে নয়, এর আনুষ্ঠানিকতা হবে শামুকখোল গ্রামে। এবারও নেই কোনো মেলার আয়োজন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শামুকখোল গ্রামের নিভর্ষী মোহন প্রামাণিক ব্যবসার সুবাদে মাঝেমধ্যেই তৎকালীন বাংলার রাজধানী কলকাতা যেতেন। কলকাতার বউবাজার, পোস্তা ও জানবাজার এলাকায় চলাফেরা করতে গিয়ে পিতলের তৈরি রথের প্রতি তাঁর দৃষ্টি পড়ে। এক সময় তিনি এ বৃহৎ রথটি নির্মাণের উদ্যোগ নেন। ১৩১৬ বঙ্গাব্দে (১৯০৯-১৯১০ খ্রিস্টাব্দ) কলকাতার ওইসব এলাকার দক্ষ সূত্রধর, ভাস্কর, লৌহকার ও রংমিস্ত্রিদের সমন্বয়ে বড় আকারের রথ নির্মাণ করে নেন।
নিভর্ষী মোহন প্রামাণিকের উত্তরসূরী মোহিনী মোহন প্রামাণিক বলেন, রথটি নির্মাণের পর নৌপথে বুড়িদহ বাজারে আনা হয়। তৎকালীন সময়ে এত বড় পিতলের রথ দীর্ঘ দূরত্বে পরিবহনের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌকা। এরপর থেকেই বুড়িদহ বাজারে রথযাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। ধীরে ধীরে এটি স্থানীয় সমাজ ও সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসবে পরিণত হয়।
তিনি আরও বলেন, বছরের এই বিশেষ আয়োজনকে ঘিরে বুড়িদহ বাজারে ১০ দিন ব্যাপী বসত বৃহৎ মেলা। সেই মেলা উপলক্ষে দুর-দুরান্তের আত্মীয়-স্বজনেরা বেড়াতে আসতেন। মিলনমেলায় পরিণত হতো আশপাশের গ্রামগুলো। আগতরা আত্মীয়তার পাশাপাশি মেলা থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে বাড়ি ফিরতেন।
মোহিনী মোহন প্রামাণিক অভিযোগ করে বলেন, ঐতিহ্যবাহী এ রথটি বুড়িদহ বাজারে খোলা অবস্থায় পড়ে থাকার কারণে চোরেরা এর মূল্যবান মূর্তি চুরি করতে শুরু করে। এ অবস্থায় নিরাপত্তার অভাবে রথটি বুড়িদহ বাজার থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় তাঁদের বাড়ির খলিয়ানে। রথটির নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেও বয়সের কারণে এখন জীর্ণশীর্ণ অবস্থা। ঐতিহ্যবাহী এ রথটি রক্ষা করতে হলে জরুরী ভিত্তিতে সংস্কার করতে হবে। পাশাপাশি মেলার আয়োজন করা হলে ফিরে আসবে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য।
আরেক উত্তরসূরী চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক দেবাশীষ কুমার প্রামাণিক বলেন, বাংলার রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি বাঙালির লোকসংস্কৃতি, সামাজিক সম্প্রীতির এক ঐতিহাসিক মিলনমেলা। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের মতো মান্দা উপজেলার বুড়িদহ বাজারের রথযাত্রাও বহন করছে এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য।
তিনি আরও বলেন, এই রথযাত্রা ঘিরে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল এর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ। হিন্দু, মুসলিমসহ বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে রথ টানতেন, মেলায় অংশ নিতেন। ব্যবসা পরিচালনা করতেন এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করতেন। এ ঐতিহ্য গ্রামীণ বাংলায় পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহাবস্থান ও সামাজিক ঐক্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই রথ স্থানীয় ইতিহাস, পারিবারিক উত্তরাধিকার, লোকজ সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে টিকে আছে। এটি শুধু একটি ধর্মীয় নিদর্শন নয়; বরং উত্তর বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি মূল্যবান সম্পদ।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, বুড়িদহ বাজারের শতবর্ষী রথযাত্রার ইতিহাস, নির্মাণশৈলী ও লোকজ ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা, প্রামাণ্য দলিল সংরক্ষণ এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। কারণ এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা মানে শুধু একটি রথকে রক্ষা করা নয়; বরং বাংলার লোকসংস্কৃতি, সম্প্রীতি ও ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অক্ষুন্ন রাখা।