
পারভেজ বাঙালী,চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি
চট্টগ্রামে গত ৩৩ বছরের রেকর্ড ভেঙে চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ ৩৮৬.৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এমন রেকর্ড পরিমাণ ভারী বর্ষণের মধ্যেও নগরবাসীকে জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্ত রাখতে নিজে মাঠে নেমেছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিনি সার্বক্ষণিক তদারকি করার পাশাপাশি দুর্যোগকালীন জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে ১০১ সদস্যের একটি ‘র্যাপিড রেসপন্স টিম’ গঠন করেছেন।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকাল থেকেই মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা, কাতালগঞ্জ, টাইগারপাস, পাঁচলাইশসহ বিভিন্ন জলাবদ্ধতাপ্রবণ এবং পাহাড়ঘেঁষা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।
পরিদর্শনকালে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, “চট্টগ্রামে মৌসুমের রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে। এই বৃষ্টির কারণে যাতে নগরবাসী দীর্ঘসময় জলাবদ্ধতার দুর্ভোগে না পড়েন, সে লক্ষ্যে আমরা বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে কাজ করছি। আমি নিজে মাঠে থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।”
মেয়র জানান, চট্টগ্রাম নগরীর মেগা জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং এর সুফল নগরবাসী পাচ্ছেন। তবে অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ কাজ—বিশেষ করে হিজড়া খাল, জামালখান খাল ও গুলজার খালের কাজ বাকি থাকায় কিছু এলাকায় সাময়িক পানি জমেছে। তিনি স্পষ্ট করেন:
কাতালগঞ্জ ও পাঁচলাইশ: এলাকাটি ভৌগোলিকভাবে নিচু হওয়ায় এবং হিজড়া খালের কাজ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেড কর্তৃক বর্ষার কারণে সাময়িক স্থগিত থাকায় এখানে পানি জমেছে। তবে বৃষ্টি থামার ১ থেকে ১.৫ ঘণ্টার মধ্যেই পানি নেমে যাচ্ছে। বর্ষা শেষে কাজ পুরোপুরি শেষ হলে এই সমস্যা থাকবে না।
অগ্রগতি: এবার বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, মির্জাপুর, বৃহত্তর বাকলিয়া, চকবাজার, কোতোয়ালী, দেওয়ানহাট, লালখান বাজার, আকবরশাহ, হালিশহর ও বন্দর এলাকায় উল্লেখযোগ্য কোনো জলাবদ্ধতা দেখা যায়নি, যা চলমান উন্নয়নকাজেরই ইতিবাচক ফল।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: আগ্রাবাদের গুলজার খালের কাজ শেষ হলে বাণিজ্যি এলাকাটির কষ্ট লাঘব হবে। এছাড়া ৪০টি খালের উন্নয়নে নতুন ডিপিপি (DPP) বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা ভবিষ্যতে প্রায় ‘শূন্যের কোঠায়’ নেমে আসবে।
পরিদর্শনকালে নালা-নর্দমা পরিষ্কার করতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ পলিথিন, প্লাস্টিক ও ককশিট পাওয়ার কথা উল্লেখ করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন মেয়র। তিনি বলেন, কিছু ক্লাব, কমিউনিটি সেন্টার ও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান অনুষ্ঠান শেষে অপচনশীল বর্জ্য ড্রেনে ফেলে দিচ্ছে, যা পানি চলাচলে মূল প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
মেয়র হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “যারা এভাবে যত্রতত্র বর্জ্য ফেলে নগরীকে সংকটে ফেলছে, তাদের বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে কঠোর অভিযান চালানো হবে। আইন অনুযায়ী জরিমানা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” জলাবদ্ধতা নিরসনে তিনি অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান।
মাঠ পরিদর্শন শেষে টাইগারপাসস্থ চসিক কার্যালয়ে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে এক জরুরি মতবিনিময় সভা করেন মেয়র। সভায় দুর্যোগকালীন দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে ‘চসিক-রেড ক্রিসেন্ট ১০১ সদস্যবিশিষ্ট র্যাপিড রেসপন্স টিম’ গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিনকে এই কমিটির আহ্বায়ক এবং চট্টগ্রাম সিটি রেড ক্রিসেন্টের সেক্রেটারি গোলাম বাকী মাসুদকে সদস্য সচিব করা হয়েছে।
মেয়র জানান, এই টিম চসিকের সার্বক্ষণিক মনিটরিং সেলের অধীনে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিকভাবে মাঠে কাজ করবে। দুর্যোগে নগরবাসীর যেকোনো জরুরি সহযোগিতার জন্য রেড ক্রিসেন্টের পক্ষ থেকে ০১৮০৫-৭৮৩৩৮৯ নম্বরে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
টানা বর্ষণে পাহাড়ধসের শঙ্কা বেড়ে যাওয়ায় মেয়র পাহাড়ঘেঁষা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো পরিদর্শন করেন এবং সেখানে বসবাসরত বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন। সম্ভাব্য বড় দুর্ঘটনা এড়াতে তিনি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার অনুরোধ জানান। একই সাথে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে চসিকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাহাড়ের পাদদেশে কঠোর নজরদারি বজায় রাখার নির্দেশ দেন তিনি।
উল্লেখ্য, আবহাওয়া অধিদপ্তরের পতেঙ্গা কার্যালয়ের তথ্যমতে, মঙ্গলবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে দেশের সর্বোচ্চ ৩৮৬.৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে নগরীর আমবাগান আবহাওয়া অফিসে ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।