
জয়পুরহাট থেকে
বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসে বৃষ্টির পানিতে খাল বিল, নদী, নালা ও মাঠ পানিতে ভরে আছে। বর্ষা মৌসুমে দেশীয় প্রজাতির ছোট মাছ ধরার প্রাচীন পদ্ধতির চাঁই বা খলশানি বিক্রির চাহিদা বেড়েছে বর্ষা মৌসুমে। জয়পুরহাট জেলা শহরের নতুন হাটসহ বিভিন্ন হাট-বাজারের খলশানি বিক্রির ধুম পড়েছে। যত বর্ষা তত বিক্রি। খরাতে বেচা বিক্রি মন্দা। এমনটাই জানালেন খলশানি তৈরির কারিগররা।
শনিবার (১৩ জুন) জয়পুরহাট শহরের নতুন হাটে সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে আসা লোকজন তাদের পছন্দ মতো খলশানি দরদাম করে কিনছেন। জয়পুরহাট জেলার ৪টি গ্রামের প্রায় আড়াইশ পরিবারের নারী পুরুষ ছোট মাছ ধরার এ ফাঁদ তৈরি করে জীবন-যাপন করেন, যা স্থানীয় ভাষায় খলশানি। ওই খলশানি ছোট-বড় আকার ভেদে বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকা থেকে ৪৫০ টাকা দামে।
খলশানি তৈরির কারিগররা গ্রামে ঘুরে গৃহস্থের বাঁশ বাগান থেকে ২০০-২৫০ টাকা দামে বাঁশ কেনেন তারা। ভালো একটি বাঁশ থেকে ৫-৬টি খলশানি তৈরি হয়। আর বড় মাপের খলশানি হয় ৪টি। বাঁশ থেকে চিকন চিকন কাঠি তৈরি করতে হয় প্রথমে। তাল গাছের ডাল কেটে নিয়ে বাড়ির চৌবাচ্চাতে কয়েক দিন ভিজিয়ে নিতে হয়। পচানো ডাল কাঠের হাতুড়ি দিয়ে থ্যাঁতলে চিকন আঁশ বের করা হয়।
তারপর বাঁশের চিকন কাঠিগুলো ওই আঁশ দিয়ে বুনিয়ে (গেঁথে) নিলে খলশানির প্রাথমিক কাঠামো তৈরি হয়। এ কাজটি করেন বাড়ির মহিলারা। তারপর পর বাঁশের ফালটা সুন্দর করে বেঁধে খলশানি তৈরির কাজটি করেন পুরুষরা। জয়পুরহাট জেলাসহ নওগাঁ জেলার ধামুইরহাট মঙ্গলবাড়ি, দিনাজপুরের হাকিমপুর, বিরামপুর হাটে বিক্রি হয় খলশানি।
নতুনহাটে খলশানি বিক্রি করতে আসা সদর উপজেলার বারইল, ক্ষেতলাল উপজেলার দীঘিরপাড়, খান্দার গ্রামের কারিগর পরিমল চন্দ্র, বাসুদেব, সুদেব, পশুরাম জানালেন, মূলত বাড়ির নারীরা খলশানি তৈরিতে শ্রম না দিলে তাদের একার পক্ষে এ কাজ করা সম্ভব হতো না। ঘর গৃহস্থালির কাজ করে অবসরে খলশানি তৈরির কাজ করেন মহিলারা। প্রতি সপ্তাহে ৫ থেকে ৬টি খলশানি তৈরি করেন তারা। প্রচুর শ্রম আর কষ্টের কাজ হলেও আশাতীত দাম পান না তারা।
কীটনাশক ব্যবহারে ছোট মাছ কমে যাওয়ায় খলশানি বিক্রিও কমছে দিন দিন। বাপ-দাদার পেশা জমিজমা নেই, তাই ছাড়তে পারিনি। এমন মন্তব্য খলশানি তৈরির জয়পুরহাটের কারিগরদের।
তাল গাছের ডালের আঁশ দিয়ে খলশানি বানানো বিষয়ে পরিমল বলেন, আঁশ পানিতে পচে নষ্ট হয় না। আর সুতা পানিতে দ্রুত পচে যায়। এ জন্য খলশানিতে তাল গাছের আঁশ ব্যবহার করা হয়।
জেলার বাগজানা গ্রামের কৃষক বদিউজ্জামান বলেন, তিনি গ্রামের মাঠে মাছ ধরার জন্য ১২টি খলশানি ২৫০ টাকা দামে কিনেছেন। খলশানিতে পুঁটি, ময়া, জালমাছ (চিংড়ি,) দাড়কিনা, ছোট কৈ মাছ পাওয়া যায়।