
ন্যাশনাল ডেস্ক
ছোট্ট দুই ভাই-বোনের প্রধানমন্ত্রীর কাছে লেখা একটি চিঠি বদলে দিচ্ছে পটুয়াখালীর তিন উপজেলার প্রায় ১৫ লাখ মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি। বাউফল উপজেলার ‘বগা’ ও দুমকি উপজেলার ‘চরগরবদি’র মাঝ দিয়ে প্রবাহিত লোহালিয়া নদীতে অবশেষে নির্মিত হতে যাচ্ছে স্বপ্নের সেতু।
লোহালিয়া নদী পারাপারের একমাত্র অবলম্বন ছিল ফেরি। এই ফেরি পারাপারে বিড়ম্বনার যেন শেষ ছিল না। প্রতিদিন যাত্রীবাহী বাস কিংবা রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেরির অপেক্ষায় আটকে থাকতে হতো। ফলে অসহ্য ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছিল বাউফল, দশমিনা ও দুমকি উপজেলার প্রায় ১৫ লাখ মানুষকে। বগা ফেরিঘাটের এই বিড়ম্বনার তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিল শিশু মাহমুদ ইয়ামিন ও আবিরা।
দুই মাস আগে অসুস্থ নানাকে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে বগা ফেরিঘাটে আটকে যায় তাদের বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটি। ফেরি পারাপারের অপেক্ষায় থাকা ওই অ্যাম্বুলেন্সের ভেতর অসুস্থ নানার পাশে বসা ছোট্ট দুই ভাই-বোনের মনে তখন অসম্ভব কষ্ট। তাদের মনে হচ্ছিল—এই নদীতে ফেরি না থেকে যদি একটি সেতু থাকত, তবে নানাকে দ্রুত বরিশাল হাসপাতালে নেওয়া যেত।
অপেক্ষার প্রহর যে কত কষ্টের, তা ইয়ামিন ও আবিরা সেদিন মর্মে মর্মে উপলব্ধি করে। প্রায় ঘণ্টাখানেক অপেক্ষার পরেও ফেরি না আসায় হৃদরোগে আক্রান্ত নানাকে নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছিল তাদের। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ফেরি এলে তারা গন্তব্যে রওনা হয়।
ফেরিঘাটের পরিস্থিতি নিয়ে যে তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি তারা হয়েছিল, তাতে সাধারণ মানুষের এই কষ্ট তাদের মনে স্থায়ী দাগ কেটে যায়। এসব সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন—এই ভাবনা থেকেই বাড়ি ফিরে লোহালিয়া নদীতে একটি সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে গত ১৯ এপ্রিল ইয়ামিন ও আবিরা প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি চিঠি লেখে।
পরে প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে লেখা সেই চিঠি গণমাধ্যমে প্রচারিত হলে তা দ্রুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নজরে আসে। শিশু ইয়ামিন দুর্ভাগ্যবশত সেদিন গণমাধ্যমের মুখোমুখি হতে না পারলেও, তার ছোট বোন আবিরা সাহসের সঙ্গে গণমাধ্যমের সামনে কথা বলে।
চিঠি পাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী কালবিলম্ব না করে গত ১৯ মে সেতুর সম্ভাব্যতা যাচাই করতে সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমকে বাউফলে পাঠান। তিনি লোহালিয়া নদীর প্রস্তাবিত সেতু স্থল সরেজমিন পরিদর্শন করেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন পটুয়াখালী সদর আসনের সংসদ সদস্য এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, বাউফলের এমপি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এবং জেলা বিএনপির সভাপতি স্নেহাংশু সরকার কুট্টিসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
বহুল কাঙ্ক্ষিত বগা সেতুর নির্মাণস্থল পরিদর্শনকালে সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘আবিরার চিঠি প্রধানমন্ত্রীর নজরে এসেছে। তাই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই সেতুর সম্ভাব্যতা যাচাই করার জন্য এখানে এসেছি। ইনশাআল্লাহ, চলতি বছরের শেষ দিকে কিংবা আগামী বছরের শুরুতে এখানে সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হবে।’
পরে সেতুর প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বরাবর চিঠি লেখার জন্য সেতুমন্ত্রী ছোট্ট আবিরাকে পুরস্কৃত করেন।
এদিকে, সামান্য একটি চিঠির কারণে পটুয়াখালীর বাউফল, দশমিনা ও দুমকি উপজেলাবাসীর ভাগ্য বদলে যাওয়ার খবরে আবিরাকে নিয়ে পুরো এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
আলোচিত সেই চিঠির লেখক দুই ভাই-বোনের বাবা আপেল মাহমুদ মধু বরগুনা প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে ক্লিনিক্যাল ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে কর্মরত এবং মা নাজমুন নাহার ইরানি বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা।
আবিরা দাশপাড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী এবং তার বড় ভাই মাহমুদ ইয়ামিন বাউফল মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী।