
রানীনগর (নওগাঁ) প্রতিনিধি
নওগাঁর রাণীনগর উপজেলায় চলতি ইরি-বোরো মৌসুমে ধানের বাম্পার ফলন হলেও ন্যায্য দাম না পেয়ে গভীর হতাশায় পড়েছেন এলাকার কৃষকরা। বর্তমানে স্থানীয় বাজারে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৯৫০ থেকে ১০৫০ টাকায়, যা উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম। এই দামে ধান বিক্রি করে লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের।
স্থানীয় কৃষক রমজান আলী জানান, এই মৌসুমে প্রতি বিঘা জমিতে ধান উৎপাদন করতে সার, বীজ, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিক মিলিয়ে খরচ হয়েছে ১৬ থেকে ১৭ হাজার টাকা। অথচ উৎপাদিত ধান বিক্রি করে সেই খরচও পুরোপুরি উঠছে না। ফলে প্রতি বিঘায় লোকসান দিয়ে ঘরে ফিরতে হচ্ছে তাদের।
অন্যের জমিতে বর্গা চাষ করেন এমন কৃষকদের অবস্থা আরও বেশি করুণ। বর্গাচাষি আশাদুল ইসলাম বলেন,
“আমি অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করি। শুধু একবিঘা জমি ইরি মৌসুমে বর্গা রাখতেই জমির মালিককে দিতে হয় ১০ হাজার টাকা। এর পাশাপাশি সার, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিক খরচ মিলিয়ে উৎপাদন খরচ কমপক্ষে আরও ১৬ থেকে ১৭ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে এক বিঘায় খরচ দাঁড়ায় ২৬ থেকে ২৭ হাজার টাকারও বেশি। এই দামে ধান বিক্রি করে আমাদের কোনো লাভ তো নেই-ই, বরং প্রতি বিঘায় বড় অঙ্কের ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।”
কৃষকরা আরও জানান, মাঠে ধানে রোগবালাই বা পোকার আক্রমণ বাড়লে উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যায়। সেক্ষেত্রে বাড়তি কীটনাশক ও পরিচর্যার খরচ যোগ হয়ে ক্ষতির পরিমাণ আরও বড় হয়। এমন পরিস্থিতিতে ধান চাষ অব্যাহত রাখা তাদের জন্য দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।
রাণীনগর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার মোস্তাকিমা খাতুন জানান, চলতি ইরি-বোরো মৌসুমে উপজেলায় মোট ১৮,৭০০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও হয়েছে আশানুরূপ। মাঠে মাঠে সোনালি ধানের সমারোহ দেখে কৃষকদের মনে আনন্দ থাকলেও, ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার শঙ্কা তাদের চিন্তিত করে তুলছে।
সরকার এ মৌসুমে প্রতি কেজি ধানের মূল্য ৩৬ টাকা নির্ধারণ করেছে। তবে সরকারিভাবে ধান ক্রয় শুরু হওয়ার আগেই অনেক কৃষক তাদের উৎপাদিত ধান বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন, এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কম দামে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
এর পেছনে মূল কারণ হলো কৃষকদের তাৎক্ষণিক আর্থিক প্রয়োজন। ফসল তোলার পরপরই অনেক কৃষককে ঋণ পরিশোধ, সংসারের খরচ মেটানো এবং পরবর্তী মৌসুমের প্রস্তুতির জন্য নগদ অর্থের সংস্থান করতে হয়। এই বাধ্যবাধকতার সুযোগ নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা কম দামে ধান কিনে নিচ্ছেন, ফলে কৃষক তার পরিশ্রমের ন্যায্য পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এই পরিস্থিতিতে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার কৃষকদের প্রতি বিশেষ পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, যাদের এখনই অর্থের প্রয়োজন, তারা যেন প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প পরিমাণ ধান বিক্রি করেন এবং বাকি ধান ঘরে সংরক্ষণ করে রাখেন। কারণ সরকারিভাবে ধান ক্রয় কার্যক্রম শুরু হলে নির্ধারিত ন্যায্য মূল্যেই কৃষকদের কাছ থেকে সেই ধান কিনে নেওয়া হবে। এতে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ধানের সঠিক মূল্য পাবেন এবং লোকসানের হাত থেকে রক্ষা পাবেন।