
সাব্বির মির্জা, তাড়াশ( সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি:
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় চলতি রবি মৌসুমের শুরুতে সার সংকট শুরু হওয়ায় দিশেহারা কৃষক ঘুরছেন ডিলারদের দ্বারে দ্বারে। উপজেলা কৃষি অফিস কখনো স্লিপ পদ্ধতি আবার কখনো উন্মুক্ত পদ্ধতিতে সার দেয়ায় আরো জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি ডিলাররদের বিরুদ্ধে (পরিবেশক) কৃত্রিম সার সংকট সৃষ্টি করার অভিযোগও উঠেছে। অথচ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলছেন, এ উপজেলার জন্য পর্যাপ্ত সার বরাদ্ধ রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তাড়াশ উপজেলায় মোট ডিলার (পরিবেশক) রয়েছেন ২৯ জন। এরমধ্যে বিসিআইসি’র ডিলার রয়েছে ১২ জন ও বিএডিসি’র ডিলার রয়েছে ১৭ জন। এছাড়া পৌরসভা ও আট ইউনিয়নে ৭২ জন সাব ডিলার রয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী উপজেলার আট ইউনিয়নের মধ্যে চার ইউনিয়নের মাঠে রোপা আমন ধান রয়েছে । অর্থাৎ অর্ধেক চাষযোগ্য জমিতে এই মুহুুর্তে সারের কোনো প্রয়োজন নেই।
তারপরও কৃষককে ছুটতে হচ্ছে এক ডিলার থেকে অন্য ডিলারের কাছে।
কৃষি অফিসের দেয়া তথ্য মোতাবেক, চলতি রবি মৌসুমে সরিষা, আলু, ভুট্রা, পিঁয়াজ,রসূণ সহ মৌসুমী শাক সবজীর জন্য প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরমধ্যে শুধুমাত্র সরিষাই রয়েছে ১০ হাজার হেক্টর। কৃষক বলছেন, রবি মৌসুমের শুরুতে সকল ডিলার একযোগে সার উঠালে, এ উপজেলার কৃষকদের কোনো প্রকার সার সংকট থাকার কথা নয়। এ ছাড়াও কৃষদের বরাদ্ধের স্বচ্ছ তালিকা ও কোন ডিলার কোন সার, কি পরিমাণ উত্তোলন করেছেন তারও একটি সিটিজেন চার্টার( তালিকা) থাকলে, ডিলাররা নয় ছয় করার সুযোগ পেতেন না। কিন্তু বাস্তবে তা না হওয়ায় কোনো কোনো ডিলার তার বরাদ্ধের সার নামকাস্তে বিতরণ দেখিয়ে দোকান তালা বন্ধ করে রেখেছেন।
আর কৃষি অফিস থেকে বলা হচ্ছে, আজ এ ডিলার দিচ্ছে, কাল ওই ডিলার বিতরণ করছে ইত্যাদি কথা । নিয়ম চালু করছেন জমি অনুযায়ী কখনো স্লিপ পদ্ধতি, আবার কখনো উন্মুক্ত পদ্ধতিতে সার বিক্রি। পাশাপাশি পরিবহনের অজুহাত দেখানোও হচ্ছে।
ফলে এমন টানাপোড়েনে উপজেলা জুড়ে সৃষ্টি হয়েছে কৃত্রিম সার সংকট।
আজ বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) উপজেলা কৃষি অফিসের দেয়া তথ্য অনুযায়ী তাড়াশ সদরে তিনজন ডিলার সার বিতরণ করার কথা। সে অনুযায়ী সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা যায় শুধুমাত্র পার্থ এন্টার প্রাইজ কৃষকের কাছে ন্যায্য মূল্যে সার বিক্রি করছেন। সেখানে শত শত কৃষক কে রাত ১০ পর্যন্ত সারের জন্য ভিড় করতে দেখা গেছে।
শহীদ মিনার চত্বরে মেসার্স চলনবিল পেট্রোলিয়ামে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ইউরিয়া, টিএসপি( ট্রিপল সুপার ফসফেট),পটাশ (পটাশিয়াম অক্সাইড) সার বিক্রি করছেন। তবে কৃষকের মূল চাহিদা ডিএপি (অ্যানোমিয়াম ফসফেট) সার তার দোকানে নেই। মেসার্স চলনবিল পেট্রোলিয়ামের সত্ত্বাধিকারী মো: তাইবুর রহমান বলেন, মাসের শুরুতেই ডিএপি সার বিতরণ করা হয়েছে।
হাসপাতাল গেটে মেসার্স আমজাদ এন্টারপ্রাইজের দোকান বন্ধ পাওয়া গেছে।
সরকারের কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের উৎসাহিত করা হয়েছে, ডিএপি (অ্যানোমিয়াম ফসফেট) সার ব্যবহার করার জন্য। তারা বলছেন, মূলত: ডিএপি সার টিএসপির মতন। ডিএপিতে ফসফরাসের পাশাপাশি ক্যালসিয়াম ও নাইট্রোজেন যুক্ত থাকায় এ সার গাছের জন্য অধিক উপকারী। ফলে বাজারে ডিএপি সারের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু ডিলাররা এই সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন বেশি। যারফলে হতাশ কৃষক ছুটছেন ডিলারদের এক দোকান থেকে অন্য দোকানে। শত শত কৃষক এখনো সার মেলাতে পারেননি মর্মে অভিযোগ করছেন।
কুন্দইল গ্রামের কৃষক মোজাফ্ফর হোসেন, কামরুল ইসলাম, সবুজ, ফারুক, বৃপাচান গ্রামের কৃষক আলাউদ্দিন বলেন, তারা এখনো প্রয়োজনীয় একছটাক সারও বরাদ্ধ পাননি। ফলে সরিষার আবাদ নিয়ে দু:শ্চিন্তায় রয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, কৃষকদের ব্যয় সাশ্রয় করার জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নে সরকার ডিলার ও সাব ডিলার নিয়োগ করেছেন। কিন্তু কৃষি অফিসের সাপলুডু খেলায়, তাদের কে এক ইউনিয়ন থেকে অন্য ইউনিয়নের ডিলারের কাছে সার আনতে হচ্ছে। এতে করে দিনের শ্রম নস্ট হচ্ছে, পরিবহন খরচের টাকাও গুণতে হচ্ছে। ফলে সরকারের কাঙ্খিত সেবা থেকে কৃষক বঞ্চিত হচ্ছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ডিলার বলেন, আমরা অনেক সময় বরাদ্ধের বাইরে অন্য উপজেলার সার কিনে আনি। তাতে দাম একটু বেশি পড়লেও কৃষক হয়রানি হয় না। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে চলতি বছরে এ দায়ভার তারা নেননি।
তবে সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে গিয়ে দেখা গেছে, চলনবিলের পানি ধীর গতিতে নামায়, এখনো অনেক জমি চাষ উপযোগী হয়নি। কিন্তু সার না পেয়ে হতাশ অনেক কৃষক রবি ফসলের পাশাপাশি রোরো মৌসুমের সারও মজুদ করছেন। ফলশ্রুতিতে যে ডিলার বরাদ্ধ পাচ্ছেন, তার কাছেই হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন।
এ প্রসঙ্গে তাড়াশ উপজেলা কৃষি অফিসার শর্মিষ্ঠা সেন গুপ্তা বলেন, সারের কোনো সংকট নেই। কৃষক শুধুই হতাশ হচ্ছেন। এ ছাড়াও তিনি পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, এ উপজেলার কৃষক নিয়ম মানতে চান না। কৃষি ভিাগের নির্ধারিত সারের তিনগুণ সার তারা বেশি ব্যবহার করেন। আগামীতে বেশ কয়েকটি বরাদ্ধ রয়েছে। হতাশ হওয়ার কিছু নেই।
তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী অফিসার নূসরাত জাহানের কাছে সারের কৃত্রিম সংকট ও কৃষকের ভোগান্তি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে, তিনি বলেন, নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। কোনোভাবেই সার সংকট হওয়ার কথা নয়। তারপরও এ বিষয়ে খোঁজ নেয়া হচ্ছে।